বাংলাদেশ বৈদ্যুতিক যানের যুগে প্রবেশ করল মেট্রোরেলের মাধ্যমে। মেট্রোরেলের আরেকটি বিস্ময়, এটি একটি রিমোট কন্ট্রোল যান। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে তৈরি এটি। যানটি নারী, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী- সব শ্রেণির মানুষের জন্য উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। যানজটের চিরচেনা শহরে মেট্রোর ছোঁয়া এক মাইলফলক। মেট্রোরেলের মাধ্যমে রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণের সঙ্গে নিবিড় মেলবন্ধনে আবদ্ধ হলো। এ পথে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথ যাত্রীরা মাত্র ৩৮ মিনিটে পাড়ি দিতে পারবেন।
রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকার গ্লানি থেকে মুক্তি দেবে এই মেট্রোরেল। এতদিন এর ব্যবহার ছিল উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত। গতকাল শনিবার থেকে এর পরিধি বেড়ে হয়েছে মতিঝিল পর্যন্ত। ভবিষ্যতে সুদূরপ্রসারিত হবে মেট্রোর লাইন।
২০১৭ সালের ২ আগস্ট র্যাপিড ট্রানজিট-৬ বা এমআরটি-৬ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর একনেক এমআরটি-৬ প্রকল্প অনুমোদন করে। এমআরটি-৬ কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয় ২০১৯ সালে। সূত্রমতে, ঢাকায় যানজট নিরসন ও পরিবেশের উন্নয়ন করতে ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে প্রথম প্রকল্পটি হলো এমআরটি-৬। এমআরটি ৬-এর ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার মধ্যে জাপানের ঋণ ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগ ১৩ হাজার ৭৫৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এমআরটি-৬ প্রকল্পের আওতায় উত্তরা সেন্টার স্টেশনসংলগ্ন ২৮ দশমিক ৬১ একর জমিতে টিওডি বা বহুমুখী বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মেট্রোরেলের আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের উদ্বোধন করেছেন। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের উদ্বোধন করেছিলেন তিনি।
মেট্রোরেল প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার এবং প্রতিদিন ৫ লাখ যাত্রী বহন করতে সক্ষম হবে। প্রতি চার মিনিটে প্রতিটি স্টেশনে একটি ট্রেন আসবে। প্রতিটি ট্রেন ২ হাজার ৩০০ যাত্রী নিয়ে ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে। তবে বাঁকযুক্ত এলাকায় গতি কমে যাবে।
আগারগাঁও থেকে মতিঝিল স্টেশনের দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৭২ কিলোমিটার। জনগণের সুবিধার কথা বিবেচনা করে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার পথ বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত অংশ ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে শেষ হবে। ভাড়ার ক্ষেত্রে যাত্রীদের মধ্যে যাদের র্যাপিড পাস থাকবে, তারা ভাড়ায় ১০ শতাংশ ছাড় পাবেন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে মতিঝিল অংশ চালু হওয়ায় যানজট ও বায়ুদূষণ কমবে এবং যাত্রীদের সময় বাঁচবে। সময় সাশ্রয়ের ফলে দৈনিক ক্ষতি কমবে ৮ কোটি ৩৮ লাখ, বছরে ৩ হাজার ৫৮ কোটি টাকা। আর এ করিডরে যানবাহন পরিচালনা বাবদ দৈনিক খরচ কমবে ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা, বছরে ৪৩০ কোটি টাকা। মেট্রোরেল চালু হওয়ায় বছরে ২ লাখ ২ হাজার ৭৬২ টন কার্বন নিঃসরণ কমবে, যা যানবাহনের জ্বালানির কারণে এ করিডরে নিঃসৃত হতো। এর অর্থমূল্য অন্তত ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। উত্তরা থেকে মতিঝিল যেতে যাত্রীদের সময় বাঁচবে ৬৫ মিনিট।
মেট্রোরেল একটি পরিবেশবান্ধব প্রকল্প। এর সার্বিক সুবিধা পেতে হলে রাজধানীর গণপরিবহনগুলোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আশু প্রয়োজন।
রাজধানীর অসহ্য যানজটের কবল থেকে রেহাই দিতে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প ইতোমধ্যে উন্মুক্ত হয়েছে। জনগণও সুফল পেতে শুরু করেছে। নগরবাসীর কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে এসব মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে। মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। মেট্রোর প্রভাবে এলাকাভিত্তিক শিল্পকারখানা, আবাসন গড়ে উঠবে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে, যা অর্থনীতির চাকা সচল করে সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।