বিএনপি-জামায়াত ও তাদের সতীর্থ দল মিলে গত সপ্তাহে তিন দিন এবং চলতি সপ্তাহে দুই দিন দেশজুড়ে টানা অবরোধ পালন করেছে। একদিকে দ্রব্যমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত, অপরদিকে অবরোধ কর্মসূচিতে চরম জনদুর্ভোগ। মানুষ এই চাপ নিতে পারছে না। অনেক ব্যাংকও অবরোধের ধকল কাটাতে শুক্রবারও তাদের কার্যালয় খোলা রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
৩০ লাখের বেশি পরিবহনশ্রমিক অবরোধের কারণে প্রতিদিনকার আয়রোজগার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, গত ২৮ অক্টোবর থেকে গত রবিবার পর্যন্ত ১০৯ বাসে আগুন দিয়েছে বিএনপি-জামায়াতের অবরোধকারীরা। পুলিশ সদস্যসহ এ পর্যন্ত মারা গেছেন আটজন। অগ্নিদগ্ন হয়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি আছেন চারজন।
আগুনের ভয়ে দূরপাল্লার প্রায় ৩ লাখ বাস-ট্রাক বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন লাখো মানুষ, মূল্যস্ফীতির চাপ যেন পিছু ছাড়ছে না। অবরোধের প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে ক্ষত বাড়ছে। তথ্যমতে, দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদ এম এ আকাশ বলেন, ‘এবার অবরোধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতি ঘটার মধ্য দিয়ে। যেখানে আমদানি-রপ্তানি, দ্রব্যমূল্য থেকে শুরু করে সরকারের বাজেট ঘাটতি, ঋণ পরিশোধের বিষয়গুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্র আট বছরের মধ্যে করোনাসহ বড় ধকল সওয়া দেশের অর্থ-বাণিজ্য, শিক্ষা, পরিবহনসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের জন্য কঠিন।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে নির্বাচন কমিশনের। বিএনপিসহ ১৭টি দল নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে সাড়া দেয়নি। রাজনৈতিক বড় দুই পক্ষই এখন ‘তালগাছটা আমার’ নীতিতে অবিচল রয়েছে। দেশের সাধারণ জনগণ রাজনীতি বোঝে না, জ্বালাও-পোড়াও বোঝে না। যারা রাষ্ট্রকে পাহারা দিচ্ছে (পুলিশ) তারাও চরম ঝুঁকির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছে।
অবরোধকে ঘিরে দুই দলই রয়েছে কৌশলী ভূমিকায়। কে কাকে মোকাবিলা করতে সক্ষম, সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন দলের মধ্যে চলছে দেনদরবার। সরকারি দলের টার্গেট এখন সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন আর বিরোধী দলগুলোর হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি কঠোর হস্তে প্রতিহত করা। প্রধানমন্ত্রী গত শনিবার আরামবাগের এক জনসভায় বক্তৃতাকালে বলেন, ‘ধ্বংসযজ্ঞ কীভাবে বন্ধ করতে হয় জানা আছে।’ কিন্তু তাতেও কি পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়েছে।
হরতাল-অবরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় রোগীদের। শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা সবই স্থবির হয়ে গেছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষার মৌসুম। হরতাল-অবরোধের কারণে অনেক পরীক্ষার্থীর পরীক্ষার শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আবারও বিকল্প উপায়ে শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। ছুটির দিনগুলোতে সরাসরি ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি হরতাল-অবরোধের দিন অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার কথা ভাবছে তারা।
সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে টানা অবরোধের মধ্যে রাজধানীতে বেশকিছু বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। চোরাগোপ্তা হামলা ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
বিএনপির দেওয়া অবরোধ-প্রতিরোধে দেশের রেল, সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ নির্বিঘ্ন রাখতে ‘অপারেশন সুরক্ষিত যাতায়াত’ শুরু করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। এ লক্ষ্যে সারা দেশে ৬৫ হাজার আনসার ও ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস চলাচলে বিশেষ নিরাপত্তা (এসকট সার্ভিস) দেবে র্যাব। নাশকতা ঠেকাতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে পুলিশ। কিন্তু সাধারণ মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কমছে না।
সাধারণ জনগণ এ অবস্থা কখনো প্রত্যাশা করে না। তারা চায় অচিরেই এ সমস্যার কালো মেঘ কেটে যাক। এজন্য সংকট নিরসনে দেশের স্বার্থে জনগণের কল্যাণের কথা ভেবে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতায় পৌঁছতে হবে।