১৯৯৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য শুরু হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে তুলনামূলক কম খরচে পণ্য আমদানি করে ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও লাভবান হয়ে থাকেন। পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় ২০০৮ সালে পূর্ণাঙ্গ বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় আখাউড়া স্থলবন্দর। মূলত বন্দর দিয়ে রপ্তানি হওয়া পণ্য ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা হয়ে সরবরাহ হতো উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতে।
গত বুধবার বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত আখাউড়া আগরতলা ডুয়েলগেজ রেল সংযোগ উদ্বোধন করেছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। ১২ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলসংযোগটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার গঙ্গাসাগর রেলওয়ে স্টেশনকে ভারতের আগরতলার নিশ্চিন্তপুর রেলওয়ে স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এটি বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
আখাউড়া স্থল শুল্ক স্টেশন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত থেকে চার হাজার টন ভাঙা পাথর, ১১ দশমিক ৩ টন পেঁয়াজ এবং ৪ দশমিক ৭৫ টন আদা আমদানি হয়েছে। এ থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৪৬ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ২০ হাজার ৩৭৮ দশমিক ১৫ টন গম, পাথর, ভুট্ট ও পেঁয়াজ। রাজস্ব আয় হয় প্রায় ৫৬ লাখ টাকা।
আরেকটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি হয় ৯৬ হাজার ৫২০ টন চাল, গম, আদা ও পেঁয়াজসহ কয়েকটি পণ্য। সে বছর রাজস্ব আসে ৭ কোটি ৬১ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।
পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। কারণ ত্রিপুরার সঙ্গে অন্য রাজ্যগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন অনেকটাই উন্নত। সড়ক ও রেল যোগাযোগের আমূল পরিবর্তনে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটাই সহজ হয়েছে। বর্তমান পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় লাখ মার্কিন ডলারের হিমায়িত মাছ, রড, সিমেন্ট, প্লাস্টিক ও তুলাসহ কয়েকটি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। যা আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
বন্দরে যারা ব্যবসায়ী রয়েছেন তারা বলছেন, ভারতে পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর খুব বেশি সুযোগ না থাকলেও পণ্য আমদানির মাধ্যমে আখাউড়া স্থলবন্দরটিকে অনেকাংশে চাঙা রাখা যেতে পারে। বর্তমানে যেসব পণ্য আমদানির অনুমোদন রয়েছে, তার অধিকাংশই চাহিদার তুলনায় কম। ত্রিপুরার বাইরের রাজ্য থেকে আনতে হলে আমদানি খরচ বেড়ে যায়, ফলে মুনাফা কমে যায়।
আমদানি করা পণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির স্বল্পতার কারণে পণ্য ছাড়করণে অনেকটা সময় বিলম্ব হয়ে যায়। এতে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত মাশুল দিতে হয়। এতে আমদানি খরচ অনেক বেড়ে যায়। চলতি বছরের মে মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে ব্যবসায়ীরা তাদের চাহিদামাফিক পণ্য আমদানির অনুমতি পেতে লিখিত আবেদন জানান। এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানিতে দিন দিন নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বর্তমানে এ বন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানি প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। আমদানিও কমেছে।
আখাউড়া স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, পণ্য আমদানিতে ধীরগতির প্রধান কারণ হলো ব্যবসায়ীদের চাহিদামতো পণ্য আমদানির সুযোগ না থাকা। আমদানি বাণিজ্যে গতি আনতে হলে বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি সব ধরনের পণ্য (নিষিদ্ধ ব্যতীত) আমদানির সুযোগ দিতে হবে। যার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা যখন বাজারে যে পণ্যের চাহিদা থাকবে, সেই পণ্য আমদানি করে মুনাফা করতে পারবেন। এতে সরকার ও রাজস্ব পাবে। অন্যথায় ব্যবসায়ীদের আমদানি বাণিজ্যে অনীহা কাটবে না।’
আখাউড়া স্থলবন্দরটিতে যুগোপযোগী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন। সেই সঙ্গে বাণিজ্যসহায়ক নীতি প্রণয়নের ওপর জোর দেওয়া। সরকারের রাজস্ব বাড়াতে হলে বন্দরটি আধুনিক আমদানি পণ্য পরীক্ষায় স্বয়ংক্রিয় সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বর্তমানে আখউড়া স্থলবন্দরে একটি ট্রাকইয়ার্ড, একটি ওয়্যারহাউজ ও একটি ওয়েট স্কেল এবং ছোট্ট একটি অফিস ভবন রয়েছে।