করোনা মহামারি-পরবর্তী আমাদের অর্থনীতি অনেকটাই অসুখে নিমজ্জিত। অসুখটি সংক্রমিত হয়েছে আমদানি-রপ্তানি, বিনিয়োগ ও নিত্যপণ্যের বাজার পর্যন্ত। এর মধ্যে কিছুদিন ধরে চলছে ডলারসংকট। আমদানি দায় মেটানো এবং বৈদেশিক ঋণের সুদাসল পরিশোধ করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গিয়ে শঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে অর্থনীতির স্নায়ুতন্ত্রগুলোর দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচিতে রিজার্ভের বেঁধে দেওয়া সীমা ধরে রাখতে বারবার ব্যর্থতাও দৃশ্যমান হচ্ছে। এমতাবস্থায় রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে অর্থনীতিবিদরা বিদেশ থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস কিনতে ‘ডেফার্ড লোন’ বা ‘সরাসরি ঋণ’-এর ব্যবস্থা করতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির পরিমাণ ঠেকেছে সাড়ে ৪ বিলিয়নের বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ডলারসংকট নিয়ন্ত্রণ করতে আমদানিতে আগে থেকে বেশ কড়াকড়ি আরোপ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বিলাসী পণ্য আমদানি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় রিজার্ভ থেকে ধারাবাহিকভাবে ডলার বিক্রি করে আসছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
ডলারসংকটে বিনিয়োগ পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভের পতন রোধে আমদানির ক্ষেত্রে একটি সংকোচনমূলক নীতি বাস্তবায়ন করে চলেছে। ফলে ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হারেও অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় অন্যান্য পণ্যের মতো নিত্যপণ্যের আমদানি পর্যায়েও ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে ভোক্তাপর্যায়ে নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে।
গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে অর্থনীতি বিটের সাংবাদিকদের এক পরামর্শক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় তিনি বলেন, ‘রিজার্ভ থেকে আর কোনো ডলার বিক্রি করা হবে না। এতদিন রিজার্ভের ডলার থেকে ব্যাপক সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে। তবে সামনের দিনগুলোতে এ রকম সুবিধা আর দেব না।’ সাংবাদিকরা সংকট কাটাতে ডলারে বন্ড ছাড়ার পরামর্শ দেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পেট্রোলিয়াম বা জ্বালানি তেল ও গ্যাস কেনায় বাংলাদেশকে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। সরাসরি ঋণ বা ডেফার্ড লোনের আওতায় জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানি করা গেলে রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে না।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগামী দু-এক বছর যদি ঋণের আওতায় জ্বালানি তেল-গ্যাস আমদানি করা যায়, তাহলে রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
তিনি আরও জানান, সরকার বিশ্বব্যাংক থেকে আগামী জুন নাগাদ ৫০ কোটি ডলার ও এডিবি থেকে আরও ৫০ কোটি ডলার পেতে চেষ্টা করছে। এটিও রিজার্ভ পরিস্থিতির স্থিতিবস্থার জন্য কাজে লাগবে।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, ‘ডলারের বিনিময় হারে এখন এক ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক বাজারব্যবস্থা চালু আছে। এটি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব এটি মার্কেটের নিজস্ব ভঙ্গির ওপর ছেড়ে দিতে হবে। তাহলে রেমিট্যান্স ও ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে।’
অর্থনীতিকে কীভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদদের যৌক্তিক পরামর্শ কাজে লাগাতে হবে। পেট্রোলিয়াম আমদানি ‘ডেফার্ড লোন’-এর আওতায় আনতে পারলে রিজার্ভ পরিস্থিতির অনেকটা ভারমুক্ত করা সম্ভব হবে। প্রবৃদ্ধি ও জিডিপি দুটো সূচকই অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানিতে যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তার সময়সীমা টানতে হবে।
আইএমএফের ঋণের পরবর্তী কিস্তি পেতে হলে রিজার্ভের নতুন টার্গেট পূরণ করতে হবে। সর্বোপরি রিজার্ভের চাপ কমাতে হলে এবং অর্থ-বাণিজ্য খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। সবার আগে এ খাতের নিরাপত্তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।