অডিট আপত্তি কখন হয় বা কেন হয়? এটা হয়তো অনেকেরই জানা। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাব-নিকাশে যখন অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়, তখনই আসে এই অডিট আপত্তি। খবরের কাগজ পত্রিকার তথ্যমতে, এমনই এক পাহাড়সম অডিট আপত্তির নিচে চাপা পড়ে আছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। প্রায় প্রতিবছরই কেনাকাটাসহ নানা ধরনের দুর্নীতির জালে আটকা থাকে স্বাস্থ্য ও পরিবার ল্যাণ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যেই বছর বছর বৃদ্ধি পায় এই মন্ত্রণালয়ের বাজেট। চলতে থাকে খাতওয়ারি খরচের বহর। হিসাবের খাতায় বাড়তে থাকে টাকার অঙ্ক। কেউ কেউ দুর্নীতি করে হয়ে যায় আঙুল ফুলে কলাগাছ। কাগজ-কলমে হিসাব-নিকাশ যেনতেনভাবে মিলিয়ে একটা গোঁজামিল হিসাব তৈরি করে রাখা হয়। আবার অনেকে কাগজে হিসাব ঠিক রাখায় সিদ্ধহস্ত, কাজের কাজ না হলেও। অনেক ক্ষেত্রে বিল-ভাউচারই ঠিক থাকে না। বিল-ভাউচার বের হয়ে এলেই দেখা যায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ। সরকারি নিরীক্ষায় ধরা পড়ে এসব অনিয়ম।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিজেদের বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। চলতি বছরের ২০ জুলাই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনটিতে স্বাক্ষর করেন একই মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব; যা গত ১৫ অক্টোবর প্রকাশ করা হয় নিজেদের প্রকাশনার ভেতরে আলাদা ফাইল করে।
অডিট আপত্তির বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ই নয়, দেশের বিভিন্ন খাতে এ অবস্থা বিরাজমান। অডিট আপত্তি হয়েছে মানেই যে দুর্নীতি হয়েছে, এটা বলা যাবে না। তবে দুর্নীতির ঝুঁকি আছে বলেই অডিট আপত্তি হয়েছে। এ ধরনের আপত্তি যখন দিনের পর দিন বাড়তে থাকে, তখন অন্য সেক্টরের লোকজন ভাবতে থাকে যে এমন অডিট আপত্তিতে কিছুই হয় না। তাই এগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা দরকার। অডিট আপত্তিই যথেষ্ট নয়, তদন্ত করে পদক্ষেপ নিতে হবে।’
খবরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ফাইল খুঁজে দেখা যায়, ‘অডিট আপত্তি’ শিরোনামে ছোট করে একটি ছক আকারে তথ্য দেওয়া হয়েছে। তবে উল্লিখিত হিসাবের খাত ও টাকার অঙ্কের বিবরণ অনুসারে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের (রাজস্ব) অডিট আপত্তির সংখ্যা ৫৬টি, টাকার পরিমাণ ১ হাজার ২৭ কোটি ৫২ লাখ। সব কটি আপত্তিই ‘জের’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উন্নয়ন খাতের ১ হাজার ৫৬৫ কোটি ৭১ লাখ। এর মধ্যে আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে সাতটির। জের আছে ১ হাজার ৯৬টি আপত্তি। সংখ্যাগত দিক থেকে সবচেয়ে বেশি অডিট আপত্তি হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে।
এই অধিদপ্তরে আপত্তির সংখ্যা ৬ হাজার ৯১৯টি। টাকার পরিমাণ ৭ হাজার ১১৯ কোটি ৯৮ লাখ। সব মামলাই জের হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘স্বাস্থ্য প্রশাসনকে সংস্কার করার পরামর্শ বেশ আগে থেকেই দিয়ে আসছি। স্বাস্থ্যের অডিট বিভাগে যারা আছেন তাদের অবশ্যই স্বাস্থ্যের জরুরি কিছু ব্যবস্থাপনা ও কেনাকাটার বিভাগে আলাদা করে জ্ঞান রাখতে হবে।পাশাপাশি ক্রয়সংক্রান্ত কাজে যারা জড়িত, তাদের অধিকতর সতর্ক থেকে সব কাজ পরিচালনা করতে হবে। কোনো কাজে অস্বচ্ছতা রাখা যাবে না।
আমাদের দেশের প্রচলিত যে অডিটব্যবস্থা, সেটা স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য কতটা উপযুক্ত তা ভেবে দেখা দরকার। স্বাস্থ্য খাতের অনেক জরুরি কেনাকাটাও করতে হয়। সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করার জন্য অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে এ কাজ করতে হয়। অন্যান্য খাতের চেয়ে স্বাস্থ্য খাতের খরচ ও হিসাবে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। অন্য খাতের মতো এখানেও এ নিয়ম প্রয়োগ করলে জরুরি কেনাকাটা বন্ধ হয়ে মানুষ ভোগান্তিতে পড়তে পারে। বিল-ভাউচারে গরমিল থাকলেই সেখানে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। তাই কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।'