ঢাকায় দিন দিন কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। ইদানীং পত্রপত্রিকা খুললেই এ ধরনের সংবাদ প্রায়ই লক্ষ করা যায়। খবরের কাগজ পত্রিকায় এমনই সব তথ্য উঠে এসেছে। সন্ধ্যার পর রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনের সামনের রাস্তায় প্রতিদিন একই ধরনের এক ‘মহড়া’র দেখা মেলে। তারা একটি কিশোর গ্যাং গ্রুপ নাসা-৯-এর সদস্য। এ রকম আরও কিশোর গ্যাং চক্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজধানী ঢাকার বুকে। অবশ্য এটি এখন সংক্রমিত হয়েছে মফস্বল জেলা ও উপজেলাগুলোয়।
কিশোর গ্যাং চক্রের উৎপাত ঠেকাতে ২০১৯ সালে ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়ার নির্দেশে ঢাকা শহরে গণহারে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে দুই হাজরের বেশি সদস্যকে আটক করা হয়। এর মধ্যে কাউকে আদালতে চালান দেওয়া হয়; কাউকে মুচলেকা দিয়ে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, অনেকেই আবার বিপথে পা বাড়িয়েছে। তারা গ্রুপভিত্তিক ফেসবুক পেজ খুলে একে অন্যের বিরুদ্ধে সাইবার যুদ্ধ করছে। পেজগুলোয় অনবরত চলছে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের সদস্যদের দেখে নেওয়ার হুমকি। কোন গ্রুপ কোন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করবে, তার ‘কথিত মানচিত্র’ও প্রকাশ করেছে তারা। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা একে অপরকে সতর্ক করেছে, কেউ যেন ভুল করে অন্যের এলাকায় ঢুকে না পড়ে, এতে প্রাণনাশের হুমকিও আছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে পুলিশের আটটি ক্রাইম জোনে বর্তমানে ৯৪টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় আছে। পুলিশ এ চক্রকে দমন করতে মাঠে কাজ করছে। গত চার বছরে ১৬টি গ্যাং বেড়েছে। একই সঙ্গে পূর্বের অনেক গ্যাং নিষ্ক্রিয় হয়েছে, তবে পূর্ণাঙ্গভাবে বিলুপ্ত হয়নি। রাত হলেই এই চক্রের সদস্যরা উত্তরা থেকে খিলক্ষেত পর্যন্ত মহাসড়কে বাইক রেস প্রতিযোগিতায় নামে। এদের পুলিশ অনেকবার আটক করে থানায় নিয়ে গেলে প্রভাবশালী মহলের ফোন পেয়ে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এই গ্যাং এখনো ওই এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। পুলিশের ওয়ারী জোনের কদমতলী থানা এলাকায় গ্রুপটির বিরুদ্ধে ওই এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) ড. খ মহিদ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঢাকায় ছোট গ্যাং বা বড় গ্যাং যে-ই হোক না কেন, আইন লঙ্ঘন করলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘র্যাব বিভিন্ন সময় কিশোর গ্যাং চক্রকে ধরে আইনে সোপর্দ করেছে।’
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের ধরনেরও রয়েছে ভিন্নতা। বর্তমানে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এই কিশোররা ব্যবহৃত হচ্ছে অতিমাত্রায়। গডফাদাররা তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। অনেক কিশোর ভাসমান জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মাদক, ছিনতাই ও ডাকাতির সঙ্গে অনেকেই জড়িয়ে পড়েছে। এদের নেপথ্যে সমাজের কিছু ‘বড় ভাই’ পৃষ্ঠপোষকতা করছে। অনেক সময় দেখা যায়, কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের হেয়ার স্টাইল, আলাদা ড্রেস কোড এবং চালচলনে ভিন্ন মাত্রা।
সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় যদি ভালোভাবে কিশোরের ব্যক্তিত্বের প্রস্ফুটন না ঘটে, তাহলে পরিবারের সন্তানরা কিশোর অপরাধী হয়ে উঠতে পারে। প্রতিবাদের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। শিশু-কিশোরের যেন কোনো অপরাধ বা বিপদে না যায়, সে জন্য পরিবারকেই এগিয়ে আসতে হবে। ছোট বয়স থেকেই শিশুকে বই পড়ার প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা ক্রমশই বাড়ছে। বিভিন্ন ধরনের অপসংস্কৃতিতে বুঁদ হয়ে আছে এই প্রজন্ম। তারা এ রকম বুঝে না বুঝেই বিপথে পা বাড়িয়ে অকালেই হারিয়ে যাচ্ছে।
শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবারকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষা দিতে হবে। পরিবারের অভিভাবকদের এ বিষয়ে সচেতন করা জরুরি। শুধু নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানই নয়, এখন অপরাধে জড়িয়েছে উচ্চবিত্তের সন্তানরা ঢের বেশি। উচ্চবিত্তের সন্তানদের অনেক অভিভাবকরা সন্তান কোথায় যায়, কী করে, কার সঙ্গে মেশে- এ খোঁজই রাখে না। বরং উল্টো তাদের সন্তানদের অন্যায় আবদার প্রতিনিয়ত পূরণ করে থাকে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামীদামি গাড়ি আবদার হিসেবে পূরণ করে। এসব সন্তান রাস্তায় নেমে ধরাকে সরাজ্ঞান মনে করে- যা খুশি তাই করতে থাকে। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা বা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।