জাতীয় পরিচয়পত্র দেশের নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় একটি কার্ড। বর্তমানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হলে প্রথমেই দরকার হয় এটির। ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পাসপোর্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবখানেই এনআইডির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো তথ্যের গরমিল হলেই তা আমলে নেয় না প্রতিষ্ঠানগুলো। তখনই শুরু হয় ভোগান্তি। সেবাগ্রহীতারা সেবাপ্রাপ্তির আশায় দপ্তরে দপ্তরে গিয়ে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হন।
প্রায়শই কার্ডে নানা ধরনের ভুলের অভিযোগ পাওয়া যায়। তথ্যে একবার কোনোভাবে ভুল হলে সংশোধন করতে গিয়ে পড়তে হয় নানা রকম বিড়ম্বনায়। অনেক সময় নামের ভুল সংশোধন, জন্মতারিখ, ঠিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের দরকার হয়।
জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করতে গেলে জন্মনিবন্ধনের প্রয়োজন হয়। এ জন্য ইউনিয়ন পরিষদে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সামনে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের জন্য আসা অসংখ্য ভুক্তভোগীর জটলার চিত্র।
খবরের কাগজ পত্রিকার তথ্যমতে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় বাবর রোডের একজন বাসিন্দা মো. সুলতান মাহমুদ (৬৭)। তার এনআইডিতে রয়েছে এই নাম। কিন্তু এই ব্যক্তির তিন মেয়ের এনআইডি ও একাডেমিক সার্টিফিকেটে নাম ওঠানো হয় সুলতান মাহমুদ। এতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় মো. সুলতান মাহমুদকে।
সুলতান মাহমুদ অভিযোগ করেন, নামের এফিডেভিটসহ বিভিন্ন প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার পরও সংশোধিত এনআইডি পেতে প্রায় চার মাস সময় লেগে যায় তার।
একজন ভুক্তভোগী এনআইডি সংশোধনের জন্য কিছুদিন ধরে ঘুরছেন। তার বিদেশ যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট প্রয়োজন। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে নামের ভুলের কারণে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে ঘুরতে নিরুপায় হয়ে আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তার আর বিদেশ যাওয়া সম্ভব হয়নি।
আরেকজন ভুক্তভোগীর সন্তান জানালেন, তার মায়ের জন্মতারিখ ভুলবশত ১৯৬০ সালের স্থলে ১৯৪৮ সাল হয়েছে। বাবার বয়সের চেয়ে মায়ের বয়স ১৮ বছর বেড়েছে। তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করতে গেলে প্রয়োজন হয় জন্মনিবন্ধন সনদের। এখানেও রয়েছে আরেক বিড়ম্বনা। ইউনিয়ন পরিষদ জানায়, তার মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ লাগবে। এরপর আর জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করা সম্ভব হয়নি। এমনই হাজারও অভিযোগ নিয়ে কেউ ইউনিয়ন পরিষদে, কেউ নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরছেন।
নতুন এনআইডি বা এর সংশোধনে ভোগান্তি কিছুটা হলেও এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনকালীন এনআইডি সেবা কার্যক্রম সচল রাখাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেকে। ইসির তথ্য অনুযায়ী, বিগত সময়ে কোনো জাতীয় নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন তো দূরের কথা, সব ধরনের সেবাই স্থগিত রাখা হতো।
এনআইডি সংশোধন কাজে কেন জনভোগান্তি কমছে না- এমন প্রশ্নে এনআইডির মহাপরিচালক খবরের কাগজকে বলেন, ‘সংশোধনীসহ এনআইডি কার্যক্রমকে গতিশীল করতে আমরা নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি। তারপরও অনেক সময় আমরা গ্রাহককে হয়তো কাঙ্ক্ষিত সময়ে তা দিতে পারছি না। তারা ক্ষুব্ধও হচ্ছেন। আবার অনেকের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সংশোধনীর সঙ্গে তথ্য-উপাত্তে মিল না থাকার কারণেও কাজটি করতে বারবার তদন্তের প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির সংশোধিত এনআইডি পেতে বেশি সময় নিতে হয়।
জনসাধারণের ভোগান্তি কমাতে চলতি বছরের জানুয়ারি ইসির সমন্বয় সভায় এনআইডি সেবা কার্যক্রম চলমান রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নির্বাচনকালীন এনআইডির কারণে যাতে মানুষের জরুরি চাহিদা পূরণে বিঘ্ন না ঘটে এবং ভোগান্তিতে পড়তে না হয়; সে জন্য তফসিল ঘোষণার পরও শুধু ভোটকেন্দ্র স্থানান্তর ছাড়া সব ধরনের কার্যক্রম আমরা সচল রেখেছি। আইডি কার্ড সংশোধনসংক্রান্ত সব কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বানও জানানো হয়েছে।’
নাগরিকদের পরিচয়পত্র ঝামেলামুক্ত করতে যে আধুনিকায়ন করা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে যেন জনদুর্ভোগ না বাড়ে। জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের জন্য আবেদনের প্রক্রিয়া জানেন না বেশির ভাগ ভুক্তভোগী। আবার অনেকের বিড়ম্বনা ও জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও সংশোধনে আসছে ভুল। তাই সাধারণ নাগরিকদের এনআইডি সংশোধনের বিড়ম্বনা দূর করতে নির্বাচন কর্মকর্তাদের আরও সহযোগী মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আরও মনোযোগী হতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের কার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সফটওয়্যারে ইউজার অ্যাকাউন্টটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। সর্বোপরি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টি প্রতিটি সেক্টরে নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলেই জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে জনদুর্ভোগ অনেকাংশে কমবে।