চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে শিক্ষাক্রমের এই রূপান্তর ছিল অতি জরুরি। স্বাধীনতার পর শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অধিকাংশ পরিবর্তনেই সঙ্গী ছিল বিতর্ক। কখনো কমিশন গঠন, কখনো শিক্ষানীতি আবার শিক্ষাক্রমের আংশিক পরিবর্তনকে ঘিরে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনায় বিভক্ত হয়ে পড়েন অংশীজনরা। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়েও আছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। মতভেদ রয়েছে অভিভাবক, মন্ত্রণালয় ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। একদল বলছে, এটি জাতির শিক্ষাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে। তবে চলমান বিতর্ক বন্ধে শিক্ষা খাতের বিজ্ঞজনদের মতামত নিয়ে দ্রুত জাতীয় পর্যায়ের বড় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলেও এ অঞ্চলের শিক্ষার পরিবর্তনে শাসকগোষ্ঠীর চাহিদার আলোকে কয়েকটি কমিশন গঠন করা হয়। স্বাধীনতার পর দেশে মোট পাঁচটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত প্রতিটি কমিশনই শিক্ষা নিয়ে বিস্তারিতভাবে তাদের প্রতিবেদন তুলে ধরে সরকারের কাছে। ১৯৭২ সালে গঠিত কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনে সংবিধানের চারটি মূলনীতির প্রতি সামঞ্জস্য রেখে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি জোর দেওয়া হয়। ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতির ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয় জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১। এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২২ সালে ৬২টি বিদ্যালয়ে পাইলটিং প্রকল্প পরিচালনা করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে বই দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে নতুন বই দেওয়া হয়েছে। আগামী বছর পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে, ২০২৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে এবং ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে নতুন এই শিক্ষাক্রম চালুর পর অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট মহল থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনা করা হয়। পরীক্ষা পদ্ধতি তুলে দেওয়া, বিভাগ বিভাজন, শিক্ষা-উপকরণ, দলগত কাজ, চাকরি ও ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন মহল থেকে উত্থাপিত বিষয়গুলোকে অপপ্রচার আখ্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয় এনসিটিবির পক্ষ থেকে। সমালোচনার কারণে অসংগতি থাকায় প্রত্যাহার করা হয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির দুটি বই। তারপরও বিতর্ক বন্ধ না হওয়ায় থানায় সাধারণ ডায়েরি ও মামলার মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হয় কয়েকজনকে। সম্প্রতি ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে সপ্তম শ্রেণির ‘ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান’ বই নিয়ে আবারও বিতর্ক শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্রসংগঠন ও অভিভাবকের ব্যানারেও কর্মসূচি পালন অব্যাহত রয়েছে।
সরকার বলছে, ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে নতুন কারিকুলামের বিকল্প নেই। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে এখনো বিতর্ক চলছে। মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ শেষ করা হচ্ছে। চাকরির বাজারে উপযোগী করে গড়ে তোলা যাচ্ছে না শিক্ষার্থীদের। দার্শনিক, সাহিত্যিক সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। জীবনের সমস্যা সমাধানেও ছাত্রদের প্রস্তুত করা যাচ্ছে না। সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে ছাত্রদের বিশ্লেষণের যোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করা হলেও শিক্ষায় বড় ধরনের রূপান্তর দরকার ছিল।
কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের জন্য যোগ্য জনশক্তি তৈরি করতে শিক্ষাক্রম বা কারিকুলাম প্রস্তুত করা হয়। সেখানে চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখতে হয়। সেগুলো হলো ইনটেনশন বা ইচ্ছা, কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু, মেথড বা পদ্ধতি এবং অ্যাসেসমেন্ট বা মূল্যায়ন। এই চার বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে হোঁচট খাওয়া হতে পারে বিতর্কের মূল কারণ।
এই চারটা বিষয় যদি একই সময়ে প্রাসঙ্গিক থাকে, তাহলে কোনো ধরনের বিতর্কের সুযোগ নেই। যখন চারটা বিষয়ের আন্তসম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়, তখন শিক্ষাক্রমের লক্ষ্যপূরণ সম্ভব হয়ে ওঠে না। আমাদের দেশে কারিকুলাম নিয়ে সবাই কথা বলতে চান। নতুন জিনিস নিয়ে বিতর্ক আসবেই। এই বিতর্কটাকে ইতিবাচকভাবে নিতে হবে। যদি ফাউন্ডেশনটা ঠিকমতো দেওয়া যায়, তাহলে বিতর্ক হবে না। অংশীজনদের মতামত নিয়েই নতুন কারিকুলাম প্রস্তুত করা হয়েছে। কারিকুলাম পরিবর্তনে আন্তর্জাতিক মাত্রাটা দেখা হয়েছে।
এনসিটিবির শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও মূল্যায়ন শাখার ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর আহমদ ওবায়দুস সাত্তার ভূঁইয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘কারিকুলাম হঠাৎ করে করা হয়নি। গবেষণার মাধ্যমে এটি করা হয়েছে। আরও আগে করা দরকার ছিল। আমরা ১০ বছর পিছিয়ে গেছি।’
যারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করছেন তাদের গঠনমূলক মতামত প্রদান করতে হবে। নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের সুবিধা দরকার সেটা আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলোতে নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনদের নতুন কারিকুলাম নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো প্রয়োজন।