প্রবাসে গিয়ে ধনী হবেন, পরিবারের অভাব মেটাবেন- এ ধরনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাজারও তরুণ বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু বিদেশে গিয়ে তাদের স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। কেউ কেউ পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যান। দুবাই ও ওমানে নতুন যাওয়া বাংলাদেশি তরুণরাই মূলত পাচারকারীদের প্রধান টার্গেট। যারা বিভিন্ন জায়গায় অনিয়মিত চাকরি করেন কিংবা স্বল্প বেতনের চাকরি করেন, কিন্তু বেশি বেতনের স্বপ্ন দেখেন এবং যারা কয়েক বছর ধরে চাকরি করে ভালো সঞ্চয় করেছেন, তারাও তাদের টার্গেট গ্রুপ। সাধারণত সাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যান যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও সুদানের মতো দেশগুলোর নাগরিকরা। তাদের সঙ্গে নিয়মিত বাংলাদেশি নাগরিকরাও ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাচ্ছেন। দেশি-বিদেশি পাচারকারী চক্র এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাচারের ছক কষা হয় তুরস্ক ও দুবাইয়ে বসে।
গত শনিবার লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, ইউরোপ যাত্রাকালে লিবিয়া হয়ে সাগরপথে তিউনিসীয় উপকূলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ৯ জন অভিবাসীর অধিকাংশই বাংলাদেশি নাগরিক। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি লিবিয়া উপকূল থেকে ৫২ জনের অভিবাসী দল সাগরপথে ইউরোপ যাচ্ছিল। তিউনিসীয় উপকূলে তাদের বহনকারী নৌকাটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, অবৈধভাবে ইউরোপ অভিমুখে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি মারা যান। গত ১০ বছরে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশ থেকে মোট ১৮টি রুটে লোকজন ইউরোপে যাওয়ার কমবেশি চেষ্টা করেন। পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে ইউরোপে ঢুকতে মোট ৯টি পথ আছে। বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে, যেটি সেন্ট্রাল সেডিটেরিয়ান রুট হিসেবে পরিচিত। এই পথে ৩৭ হাজার ১৯৮ জন বাংলাদেশি ইউরোপে ঢুকেছেন। গত কয়েক বছরে বলকান রুট দিয়েও প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বাংলাদেশি প্রবেশ করেছেন বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, বিভিন্ন দেশের উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ গমনের চেষ্টাকালে ২০২৩ সালে ৩ হাজারের বেশি অভিবাসী মৃত্যুবরণ করেছেন এবং নিখোঁজ হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অবৈধ অভিবাসনের বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। লিবিয়া ও তিউনিসিয়ায় নৌবাহিনী তাদের নজরদারি জোরদার করেছে। ফলে বর্তমানে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ।
তথ্যমতে, বাংলাদেশের ১০-১২টি জেলার মানুষ ঘুরেফিরে এভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যান নিয়মিত। যারা সাগর পাড়ি দেন, তারা জানেন বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ, তারপরও তারা ১৫-২০ লাখ টাকা দালালদের দিয়ে এভাবে ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় ওঠেন।
রিক্রুটিং এজেন্টদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতান খবরের কাগজকে বলেন, দালালদের দৌরাত্ম্য রোখা খুব কঠিন। এদের নেটওয়ার্ক দেশের বাইরেও। কাজেই মানুষকে সচেতন হতে হবে; যাতে দালালদের প্রলোভনে তারা সাড়া না দেন।
আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে হবে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে দালাল ও পাচারকারীদের প্রতারণার ফাঁদে যেন না পড়ে, সে বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিতে হবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভুল পথে পা বাড়িয়ে এ দেশের মানুষকে যেন লাশ হয়ে আর ফিরতে না হয়। ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশযাত্রা পরিহার করে বৈধপথ বেছে নিতে হবে। এতে নিজের জবীন যেমন বাঁচবে, তেমনি দেশের জন্যও কল্যাণকর হবে।