রাজধানী ঢাকার রেস্তোরাঁ যেন মৃত্যুকূপ। অগ্নিকাণ্ড হতেই পারে। নির্মম-নির্দয়ভাবে মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু এর দায় নিচ্ছে না কেউ। শুধুই কি এটা একটা দুর্ঘটনা, নাকি দায়িত্বশীলদের অবহেলায় প্রাণ গেল ৪৬ জন নারী-পুরুষ ও শিশুর। ঢাকা শহরের মানুষ আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিন যাপন করছেন। এভাবেই কি শঙ্কায় চলবে আমাদের জীবন? নাকি এর একটা সুরক্ষা হবে।
বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্যোগে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মানা হচ্ছে না আইনগত বাধ্যবাধকতা। এতে অগ্নিদুর্ঘটনায় অকালে ঝরে পড়ছে শিশু, নারী ও পুরুষসহ বহু প্রাণ। একের পর এক এমন দুর্ঘটনা ঘটে চললেও নতুন ভবন নির্মাণ বা পুরোনো ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষও উদাসীন। আইনগত বাধ্যবাধকতা প্রতিপালন করতে ফায়ার সার্ভিসের ক্ষমতাও শুধু নোটিশ ইস্যু করা পর্যন্ত। মালিকপক্ষের গাফিলতি ও কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে রাজধানীসহ সারা দেশে বহুতল বাণিজ্যিক ভবনগুলো যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে রাজউক জানিয়েছে, ভবনটিতে রেস্তোরাঁ বা পণ্য বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কোনো অনুমোদন ছিল না। আগুনের ঝুঁকি ও অনুমোদন না থাকার পরও ভবনটিতে আটটি রেস্তোরাঁ চলছিল বছরের পর বছর ধরে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজের অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের বেশির ভাগই মারা গেছেন আগুন থেকে সৃষ্ট বিষাক্ত কালো ধোঁয়ার প্রভাবে। তাদের শরীর ছিল অক্ষত। এভাবে মানুষের মৃত্যু খুবই বেদনাদায়ক, কষ্টকর। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে আটকে পড়ে শ্বাসনালিতে বিষাক্ত ধোঁয়া ঢুকে পড়ে। অক্সিজেনের ঘাটতি হয়ে কার্বন মনোক্সাইড তৈরি হলেই এমনটা হয়।
আগুনের ভয়াবহতা ও মৃত্যুর পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ভবনটিতে কোনো অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে তিনবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তা ছাড়া ওই ভবনে কোনো অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ছিল না। মানুষের আসা-যাওয়ার জন্য একটি ছোট সিঁড়ি ছিল।
ফায়ার সার্ভিস রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, ভবনটি অগ্নি ও জননিরাপত্তার দিক থেকে খুবই নাজুক অবস্থায় আছে, যা আদৌ কাম্য নয়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। বৃহস্পতিবার রাস্তায় অনেক যানজট ছিল, সে কারণেও যথাসময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে যেখানেই আগুন লাগুক, জনগণ অভিযোগ করে ফায়ার সার্ভিস সব সময় দেরি করে আসে। তাদের একটু গাফিলতি বা দেরির কারণে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যায়। জনগণের প্রাণ রক্ষার উদ্যোগ নিতে কেন এত বিলম্ব! আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতায় জোর দিতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডে অনেক মানুষ মারা গেছেন, এই মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভবনটিতে মাত্র একটি সিঁড়ি থাকায় ধোঁয়ার কারণে মানুষ সেখানে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। আমরা একটি তদন্ত কমিটি করেছি, আমরা আসলে দেখতে চাই কারও কোনো গাফিলতি আছে কি না। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
ভবন নির্মাণের সময় জরুরি সিঁড়ি, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, ভবনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি বহুতল ভবনেই সব নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকতে হবে এবং দুটি সিঁড়ি নিশ্চিত করতে হবে। ভবনমালিকদের ভবন নির্মাণে নীতিমালা মেনে চলতে হবে। ভবনগুলো যেন হঠাৎ করেই মৃত্যুফাঁদ না হয়ে ওঠে, এ জন্য কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থেকে কাজ করতে হবে। বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্যোগে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা আর দেখতে চাই না।