বিশুদ্ধ বায়ু ছাড়া পৃথিবীতে কোনো জীবের অস্তিত্ব টিকে থাকা সম্ভব নয়। দেশে বায়ুদূষণ ভয়াবহ অবস্থায় চলে গেছে। বেশির ভাগ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মাত্রাতিরিক্ত বাড়ছে। উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি বায়ুদূষণের কারণে ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই। বাতাসে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক কণা, ধুলাবালি, ভাইরাস, জীবাণু মিশে থাকে, যা মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে চলে যায়। এর মাধ্যমে শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহ তৈরি হয় এবং কাঁশি, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। দীর্ঘ মেয়াদে পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। এমনকি ফুসফুস ক্যানসারের কারণ এই বিষাক্ত বায়ু, যা ক্রমান্বয়ে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। বিষাক্ত বায়ুর কারণে দেশে মানুষের মৃত্যু বাড়ছে। শিশু, নারী, গর্ভবতী এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
‘আইকিউএয়ার’-এর প্রতিবেদনে সব সময় শীর্ষে বাংলাদেশের অবস্থান। ২০১৮ সাল থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের নাম। শুধু দেশ নয়, নগরী হিসেবে ঢাকা বিশ্বের দূষিত স্থান হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। শাসকষ্ট ও হৃদরোগের মতো বিভিন্ন রোগে মৃত্যুর একমাত্র কারণ বায়ুদূষণ। অবৈধ ইটভাটা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, নির্মাণকাজ ও শিল্প-কারখানা থেকে সৃষ্ট ধুলাবালি এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে না ওঠার কারণে বায়ুদূষণ বেড়ে চলছে। তা ছাড়া ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোর কারণে বায়ুদূষণ চরম মাত্রায় বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গবেষণার মাধ্যমে করণীয় ঠিক করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাকসুদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, দেশে শুধু বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করবে- এ রকম সংস্থার বিশেষ দরকার। বায়ুদূষণ কমাতে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা বাড়াতে হবে। এরপর আমাদের অগ্রাধিকার ঠিক করে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ সহজে সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় আর্থিক সক্ষমতা। এ জন্য সরকারকে পলিসি গ্রহণ করে এগিয়ে যেতে হবে। সরকার যদি তার ভিশন ঠিক করতে না পারে, অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে। সরকারকে অবশ্যই বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। নির্মাণাধীন এলাকায় কীভাবে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
অধ্যাপক ডা. রাশেদুল হাসান বলেন, কোভিডের সময় সবাই মাস্ক ব্যবহার করলেও এখন আর সেভাবে মাস্ক ব্যবহার হচ্ছে না। কিন্তু বায়ুদূষণ থেকে রক্ষায় ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে ভালো উদ্যোগ এটাই। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও কার্যকর করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং মনসুন এশিয়ান অ্যান্ড ওশেনিয়া নেটওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্য আব্দুস সালাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আসছে না। যারা দায়িত্বে আছেন, তারা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন না। শিল্প-কারখানাগুলোও এ ব্যাপারে উদাসীন।’ বায়ুদূষণের বিষয়টি শুধু বিদেশের কাছে তুলে ধরার বিষয় নয়, দূষণ নিয়ন্ত্রণ জনস্বাস্থ্যের বিষয়। সরকারকে সবুজায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া দূষণ প্রতিরোধে জলাভূমিও দরকার। জলাভূমি কীভাবে বাড়ানো যায় তা খতিয়ে দেখতে হবে। তা না হলে দেশে বায়ুদূষণের ভয়ংকর রূপ দেখতে হবে।
বায়ুদূষণ কমাতে হলে গাড়ির গতি ঠিক করে দেওয়া বিশেষভাবে দরকার। নির্মাণকাজ সরকারি বা বেসরকারি, ব্যক্তি উদ্যোগে হোক, সেখানে বায়ুর মান মাপার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যথাযথভাবে আইন প্রয়োগে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। পাশাপাশি জনগণকেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষায় সবাইকে তাদের অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাই দায়িত্বশীলতার পরিচয় না দিলে পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
বায়ুমান উন্নয়নে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাস ও বায়ুদূষণ রোধে সৌরশক্তি উৎপাদনের বিকল্প নেই। প্রত্যেক মানুষকে অন্তত একটি বৃক্ষ রোপণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিল্পায়নের অগ্রগতি বজায় রেখেই দেশবাসীকে দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বায়ুদূষণ কমাতে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা বাড়াতে হবে। দূষণে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে এবং তাদের ওপর গ্রিনট্যাক্স, কার্বনট্যাক্স কার্যকর করতে হবে।