নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা এখন প্রায় ফিকে হতে বসেছে। উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূলে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ খুবই প্রয়োজন। অথচ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত এ মানদণ্ডের অনুপস্থিতি লক্ষ করার মতো। নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন সৎ মানুষ এখন কোণঠাসা হয়ে আছে। দেশের মানুষের মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে সমাজে এক ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। সন্তান বিচ্ছিন্ন হচ্ছে বাবা-মা, নিকটাত্মীয় থেকে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের দিকেই ঝুঁকছে গোটা সমাজব্যবস্থা। একক পরিবারে বাঁধা পড়েছে বর্তমান প্রজন্ম। তারা সামাজিক সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।
শুধু চার দেয়ালে বন্দি থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে চরমভাবে ঝুঁকছে। প্রযুক্তির নেশায় এতটাই বুঁদ হয়েছে যে, তাদের রক্ত-মাংসের মানুষের প্রতি ভালোবাসা সম্মানের থেকে রঙিন দুনিয়াকে ধারণ করছে। এর ফলে সন্তান থেকে বাবা-মা অথবা পরিবারের সদস্যরা সম্পর্কের ইতিবাচক প্রভাব থেকে বহুদূর পিছিয়ে পড়ছে। রক্তের বন্ধন ছিন্ন হচ্ছে এভাবেই। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য তরুণ প্রজন্মকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে অবক্ষয়ের ক্ষত সরাতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নৈতিকতা চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। এটাকে আইন দিয়ে কোনো কিছু করা যাবে না। এটা উপলব্ধির বিষয়, নিজে থেকে অর্জন করতে হবে। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে আমলা, পুলিশ, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, বিচারপতি এমনকি নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে এখন নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা নেই। মধ্যবিত্তের কেউ কেউ আলোচনা করলেও এই বোধকে সমুন্নত রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। সব মিলিয়ে সমাজে এমন এক অবস্থা দাঁড়িয়েছে, ভরসা করার মতো মানুষের আর কোনো জায়গা থাকছে না। পাশাপাশি অনুসরণযোগ্য সৎ, সজ্জন ও নৈতিকতাসম্পন্ন বিশিষ্ট নাগরিকের সংখ্যাও এখন খুব কম।
বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে সততার কারণে অনেকে নির্ভরযোগ্য হলেও রাজনীতিতে জড়িয়ে তারা আবার সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছেন। গত বছর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে জনমনে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ে সমাজে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে সেখান থেকে কিছুটা হলেও উত্তরণ ঘটবে। কিন্তু এ দিকনির্দেশনা বা উন্নতি দৃশ্যমান হয়নি এখনো। বরং ক্ষমতার নানামুখী টানাপোড়েন বা দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে। ব্যাপক দাবি-দাওয়া নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ এখন রাজপথে। উন্নয়ন, সংস্কার, নৈতিকতা ও সততাচর্চার প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে মূল্যবোধের অবক্ষয়। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ কি সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে?
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচনা-সমালোচনা যাদের নিয়ে তারা হলেন বিগত সরকারের রাজনীতিবিদ। যাদের বড় ধরনের আর্থিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। নামে-বেনামে দেশের টাকা পাচার করেছেন তারা। তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চাও কম মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এদিকে অধিকাংশ আমলার দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে ওঠার পেছনে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রশাসনে ভালো কাজের পুরস্কারস্বরূপ দেওয়া হয় শুদ্ধাচার পুরস্কার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই শুদ্ধাচার পুরস্কার পাওয়া অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের ব্যাপক অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের করা শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনেও বিষয়টি দেখা যায়। তাদের মতে, চোরতন্ত্রের মূল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছেন আমলারা। সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা অথচ এই পেশাও আজ কলুষিত হয়েছে। তাদের সততা ও নৈতিকতা নিয়েও সমাজে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকদের কেউ নৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। বিচারকদের কথায় যদি বলি তাদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রায় দেওয়ার এবং আর্থিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ হরহামেশাই উঠে আসে। অর্থাৎ বিচারকরাও বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারছেন না। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এ কারণে ছাত্র-জনতাকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। এসবের জন্য নৈতিকতার অধঃপতনকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।
নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় রাষ্ট্র ও সমাজের একটি সমষ্টিগত সমস্যা। এ সমস্যা থেকে উত্তরণ পেতে হলে সামাজিক বিপ্লব গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতা জাগ্রত করতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সেই বীজ বপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজ ও পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে।