অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে টানা আন্দোলন, কর্মসূচি ও দাবির মুখে পড়েছে। দাবি আদায়ের আন্দোলনে রাজপথ অবরুদ্ধ হচ্ছে প্রতিদিন। বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় এই চিত্র যেন নিত্যদিনের হয়ে দাঁড়িয়েছে। নানা প্রয়োজনে রাজধানীতে ছুটে চলা মানুষগুলোকে এক ধরনের ভোগান্তির মধ্যে ফেলে দিয়ে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ আকস্মিকভাবে অবরোধ বা যানজটের মধ্যে পড়ছেন। অনেক সময় এসব পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে আটকে যাচ্ছে মরণাপন্ন রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার যানবাহন। বিভিন্ন দাবির আন্দোলনে ভারাক্রান্ত রাজধানী।
সরকারকে দায়িত্ব আর দাবি সামাল দিতে হচ্ছে সমান্তরালভাবে। মধ্যরাতেও সড়কে অবস্থানকারীদের কাছে হাজির হতে হচ্ছে উপদেষ্টাদের। অনেক ক্ষেত্রে দাবির যৌক্তিকতা থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে আন্দোলনকে অযৌক্তিক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারার’ মতো অবস্থা হিসেবেও দেখছেন। জিম্মি করেও দাবি আদায়ের চেষ্টা চলছে। ফলে ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে নগরীর বাসিন্দাদের। আর এসব দাবি-দাওয়ার বড় অংশই আর্থিক। তাই সব পক্ষের দাবি মানতে গেলে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব পরিস্থিতিতে শত শত দাবি এলেও কীভাবে সমাধান হবে তা সরকারের বিষয়। বিশেষ পরিস্থিতির কারণে সবার প্রত্যাশা বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার পর থেকে কম সময়ে সরকারের কাছে এত দাবি-দাওয়া উত্থাপিত হয়নি।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষে এত দাবি মানাও অসম্ভব বলে মনে করছেন তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবার দাবি-দাওয়া পূরণ করতে হলে বড় অঙ্কের বাজেট দরকার। সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিও এর মধ্যে একটি। হুটহাট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুযোগ না থাকায় সরকার বিভিন্ন কমিটি গঠনের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় রয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সোমবার সকাল থেকে তিতুমীর কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য শাটডাউন ঘোষণা করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এদিকে তাদের দাবিকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। সরকার ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে আশ্বাস দিলে অন্যরাও মাঠে নামার পরিকল্পনা করছেন। বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনরতদের আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টায় সরকার। আন্দোলনরত ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকদের দাবি মেনে জাতীয়করণ করলে রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়বে। যদিও শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা এ দাবিকে যৌক্তিক বলছেন।
খবরের কাগজের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারের প্রথম ৪৬ দিনে ঢাকা শহরের ৬৪টি সংগঠনের পক্ষ থেকে ৩৬০টি দাবি উত্থাপন করা হয়। দেশের অন্য বিভাগীয় শহরগুলো বিবেচনায় নিলে দাবির সংখ্যা হাজারের বেশি। অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দাবি আদায়ে ১৩৬টি বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে রাজধানীতে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসব দাবির দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, সংক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর বিভিন্ন দাবি-দাওয়া, যেমন- আইন প্রণয়ন করা, হামলার বিচার, পরীক্ষা বাতিল, অটোপাস, পদত্যাগের দাবি। দ্বিতীয়ত, সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে আন্দোলন। এই দিক থেকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নিম্নস্তরের কেউ বাদ যাননি। গত রবিবারও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহতরা এবং চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্যদের পরিবারও তাদের নানা দাবিতে সড়কে নামে। এতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন কাজে রাজপথে বের হওয়া সাধারণ মানুষ পড়েন মহাবিপাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল রওশন আরা জিন্নাত নাজনীন খবরের কাগজকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দাবিগুলো যৌক্তিক। বহুদিন ধরে সুযোগ-সুবিধা পাননি মানুষ। তাদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। দীর্ঘদিন মানুষ সেভাবে তাদের দাবি জানাতে পারেনি। ড. ইউনূসের সরকার ভালো করার চেষ্টা করছে। বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণে সবার প্রত্যাশা বেড়েছে। এ জন্য দাবি-দাওয়ার বহর বেড়েছে। সে কারণে রাষ্ট্রকে বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দেশের বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে দাবির যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ঘন ঘন দাবি-দাওয়া নিয়ে যারা রাজপথ দখল করে নগরীর পরিবেশ বিনষ্ট করছেন, তাদের জনভোগান্তির বিষয়টি মাথায় নিয়ে লিখিতভাবে দাবি পেশ করতে হবে। রাজধানী ঢাকা নগরী দাবির শহর না হয়ে উঠুক, সেটিই প্রত্যাশা রইল।