বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির মাত্রা নিয়ে জার্মানির বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) প্রতিবছর দুর্নীতির ধারণাসূচক (সিপিআই) প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত মঙ্গলবার তারা এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করেছে ‘দুর্নীতির ধারণাসূচক ২০২৪’। ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে এই সূচক তৈরি করা হয়েছে। সেই সূচক থেকে জানা গেছে, দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪তম। এর আগের বছর ছিল দশম। ২০২৪ সালের ধারণাসূচক অনুসারে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১তম। এর আগের বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৯তম। অবস্থানগত দিক থেকে দশম থেকে চতুর্দশ অবস্থানে নেমে এলেও বাংলাদেশে দুর্নীতি কমেনি; বরং দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার দিক থেকে বাংলাদেশের অবনতি হয়েছে। ১৪৯ থেকে নেমে এসেছে ১৫১তম অবস্থানে।
সিপিআই অনুসারে দুর্নীতি ধারণার মাত্রাকে ‘শূন্য’ (০) থেকে ‘এক শ’ (১০০) স্কেলে পরিমাপ করা হয়। এই স্কেল অনুসারে শূন্য (০) স্কোরকে সর্বোচ্চ আর এক শ (১০০) স্কোরকে ব্যাপকতার দিক থেকে সর্বনিম্ন ধরা হয়। সেদিক থেকে এবারের সিপিআই অনুসারে বাংলাদেশ আরও ১ পয়েন্ট কম স্কোর করেছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৪, এবার ১ কমে হয়েছে ২৩। অর্থাৎ দুর্নীতিতে অবনতি ঘটেছে বাংলাদেশের। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ব্যাখ্যা করে বলেছেন, বাংলাদেশের দশম থেকে চতুর্দশ অবস্থানে চলে যাওয়া মানে এ দেশে দুর্নীতি কমেনি; বরং বেড়েছে। স্কোর কমে যাওয়া থেকেই সেটা বোঝা যায়।
দুর্নীতির ধারণাসূচক (সিপিআই) থেকে আরও জানা গেছে, দুর্নীতির বৈশ্বিক গড় স্কোর হচ্ছে ৪৩। বাংলাদেশ পেয়েছে এরও অর্ধেক। একমাত্র আফগানিস্তান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। শুধু তাই নয়, গত ১৩ বছরের মধ্যে প্রাপ্ত স্কোর সর্বনিম্ন।
দুর্নীতির উল্লিখিত সূচক থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে। কী কারণে বেড়েছে, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছে টিআই। তাদের প্রতিবেদন অনুসারে, বিগত সরকারের আমলে নির্বিচারে লুটপাট, দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেওয়া এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়ায় বাংলাদেশের অবস্থানের ক্রমাবনতি ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে সরকারি প্রকল্পের কেনাকাটায়। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনসহ
(দুদক) দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তায় অর্থ পাচার ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে।
লক্ষণীয়, দুর্নীতির কারণ প্রসঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটাকে মূলত দায়ী করা হয়েছে। প্রশ্রয় দিয়েছে ক্ষমতাসীন সরকার। এমনকি বিগত সরকার দুর্নীতি সংঘটনে সহায়তা ও অংশগ্রহণ করেছে। দুর্নীতিসংক্রান্ত এই পর্যবেক্ষণ দুর্নীতির গতি-প্রকৃতি অনুসারে নতুন নয়। প্রায় চার দশক ধরে আমরা এটা দেখে আসছি, শুনে আসছি। একটা সময় বেশ কয়েক বছর বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে দুর্নীতির শীর্ষে ছিল। এখন এর সামান্য উন্নতি হলেও উল্লেখ করার মতো পরিবর্তন আসেনি। দুর্নীতি এখনো আমাদের জাতীয় অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়। বিশেষ করে দেশ থেকে অর্থ পাচারের নানা তথ্য বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। বর্তমানে ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটিও বলেছে, দেশে গত ১৫ বছরে ‘চামচা পুঁজিবাদ থেকেই চোরতন্ত্র’ তৈরি হয়েছিল। রাজনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক আমলা, বিচার বিভাগসহ সবাই তাতে অংশ নিয়েছে।
দুর্নীতির মাধ্যমে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হয়েছে।
এসব তথ্যের পাশাপাশি পাবলিক পারসেপশন বা সাধারণ মানুষের ধারণা হচ্ছে, দুর্নীতি আমাদের সমাজে সর্বত্র বিরাজমান। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় সরকারি অফিস-আদালতে। আগেও এই দুর্নীতি ছিল, এখনো আছে। নির্মূল হয়নি অথবা রূপবদল হয়েছে মাত্র। দুর্নীতি নির্মূল না হলে, নিদেনপক্ষে কমিয়ে আনা না গেলে বাংলাদেশের অগ্রগতি যে মাত্রায় হওয়ার কথা তা কখনো ঘটবে না। জাতিগতভাবে আসলে আমাদের এই দুর্নীতিকে নির্মূল করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই নির্মূলে সবচেয়ে বড় ও প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকে। সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকে সব ধরনের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। দুর্নীতি নির্মূল করার প্রধান দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশনের। দুদককে ঢেলে সাজানো হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, দুর্নীতি নির্মূলে তারা সর্বাত্মকভাবে সক্রিয় থাকবে। তবে দুর্নীতি নির্মূলের পরিবর্তে দুর্নীতি যাতে না হতে পারে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সরকারের একার পক্ষে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ জন্য জনসচেতনতার প্রয়োজন। জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন করার কাজটি সরকারকেই করতে হবে। আমরা মনে করি, দুর্নীতি কমিয়ে আনা নয়, দুর্নীতির সম্পূর্ণ মূলোৎপাটন প্রয়োজন। দুর্নীতি যাতে না হয়, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সেটা হবে সবচেয়ে ভালো দৃষ্টান্ত।