জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বলপ্রয়োগ নীতি অনুসরণ করেছিলেন তা নজিরবিহীন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শত শত হত্যাকাণ্ড, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার অন্তরালে লুকিয়ে ছিল ক্ষমতায় টিকে থাকার অপচেষ্টা। যা গত কয়েক মাসে দেশের গণমাধ্যম, সরকারের তদন্ত সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গত বুধবার প্রকাশিত জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে সংঘটিত ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের অনুসন্ধানী দল শেখ হাসিনা সরকার ও তার দলের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পায়।
এতে বলা হয়, গত জুলাই-আগস্টে বিক্ষোভের সময় সাবেক সরকার এবং তার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনী, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো একসঙ্গে পরিকল্পিতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল। আন্দোলন চলাকালে ১৮ জুলাই সাবেক সরকার বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের’ জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে অনুমতি দিয়েছিল। আন্দোলনে ১ হাজার ৪০০ জনের মতো নিহত হয়েছেন। তাদের বেশির ভাগের মৃত্যু হয়েছে রাইফেল ও শটগানের গুলিতে। হাজার হাজার মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। ওই সময় নিরাপত্তাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয় কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাদের নির্দেশেই বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। ওই সময় বিক্ষোভ দমনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন সূত্র এবং সংশ্লিষ্টদের বর্ণনা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন ওই প্রতিবেদন তৈরি করে।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভা কার্যালয় থেকে প্রকাশিত দীর্ঘ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কীভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বড় আকারের অভিযানের দিকনির্দেশনা ও তদারকি করেছিলেন। যেখানে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের গুলি করে হত্যা করেছে বা নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের জনগণের বিরোধিতার মুখেও ক্ষমতা ধরে রাখতে শেখ হাসিনা সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নৃশংসতা চালিয়েছিল।
জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিনিধিদল তদন্তের লক্ষ্যে ২৩০ জনের সাক্ষাৎকার নেয়, ১৫৩টি ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং ১ হাজারেরও বেশি ছবি, ভিডিও, রেকর্ড, ফাইলের ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ করে। এ ছাড়া ৯৫৯টি ই-মেইল পায় তদন্ত দল। প্রতিবেদনে জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত এবং সমস্যার মূল উৎস খুঁজে বের করতে ৫০টির মতো সুপারিশ করেছে। এতে রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। যেন সত্যিকার বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফেরার পথ রুদ্ধ না হয়। দল নিষিদ্ধ করলে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক ভোটারকে ভোটাধিকার চর্চা থেকে বঞ্চিত করা হবে বলে মনে করে জাতিসংঘ। প্রতিবেদনে অবাধ ও সত্যিকারের নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে নিরাপদ সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভোটের আগে সব রাজনৈতিক দল যেন সমান প্রচারের সুযোগ পায়। একই সঙ্গে নির্বাচনি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে; সে বিষয়ও নিশ্চিত করতে হবে। আরও বলা হয়, নিরপেক্ষভাবে কার্যকর, পক্ষপাতহীনতার সঙ্গে সব বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনার তদন্ত করতে হবে। র্যাব ও এনটিএমসিকে বিলুপ্ত করার সুপারিশও করা হয়েছে। ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগের সংস্কার করতে বলেছে জাতিসংঘ।
জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ব্যাপারে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। যাতে কেউই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানি বা পক্ষপাতিত্বের শিকার না হয়, সে জন্য সঠিক তদন্ত আবশ্যক। একই সঙ্গে যাতে কেউ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি না হয়, সেদিকটাও সতর্কতার সঙ্গে সরকারকে দেখতে হবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে সরকার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে, এটাই প্রত্যাশা।