১৫ বছরের ঘাসফুল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আকাশে আজ পরিবর্তনের নতুন সূর্য। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর লড়াইয়ের কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে ঘাসের ওপর এখন পদ্মের দাপট। নন্দীগ্রামের সেই ‘ভূমিপুত্র’ নবান্নের (সচিবালয়) মসনদে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময়ের সেনাপতি, আজ তারই সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে রাজদণ্ড হাতে নিয়েছেন। অবশেষে জনমতের রায়ে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যবিধাতা হয়ে ফিরলেন শুভেন্দু অধিকারী।
ওই রাজ্যে শুক্রবার এক ঐতিহাসিক পালাবদল সম্পন্ন হলো। রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী।
শুক্রবার( ৮ মে) কলকাতায় বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়কদের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বিজেপি তাকেই সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছে।
নেতৃত্ব নির্বাচন ও শাহের ঘোষণা
বিধানসভা ভবনের কেন্দ্রীয় হলে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারীর নাম প্রস্তাব করেন রাজ্য বিজেপির সাবেক সভাপতি প্রবীণ নেতা দিলীপ ঘোষ। বৈঠকে প্রধান পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এ ছাড়া ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি সহ-পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। নাম প্রস্তাবের পর উপস্থিত সব বিধায়ক করতালির মাধ্যমে তা সমর্থন করেন। বৈঠক শেষে অমিত শাহ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন, ‘আমি শুভেন্দু অধিকারীকে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে ঘোষণা করছি।’
প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা অন্যান্য নাম
যদিও শুভেন্দু অধিকারী প্রথম থেকেই দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন, তবে মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য দলের ভেতরে আরও কয়েকজনের নাম নিয়ে জোর গুঞ্জন ছিল। এই তালিকায় অন্যতম প্রতিযোগী ছিলেন দিলীপ ঘোষ। তার সাংগঠনিক দক্ষতা এবং তৃণমূল-বিরোধী দীর্ঘ লড়াই তাকে অন্যতম দাবিদার করে তুলেছিল। এ ছাড়াও আলোচনায় ছিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের নাম, যার হাত ধরে মতুয়া ভোটব্যাংক বিজেপির পালে হাওয়া দিয়েছে। এমনকি চমক হিসেবে অভিনেতা ও বিজেপি নেতা মিঠুন চক্রবর্তীর নামও শোনা যাচ্ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্গে আঘাত করার সক্ষমতাকে বিচার করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শুভেন্দুর ওপরই আস্থা রেখেছে।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া শুভেন্দু অধিকারী ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে আসেন। এবারের নির্বাচনে তিনি মমতার ঘাটিঁ হিসেবে পরিচিত ভবানীপুর আসনে লড়াই করেন এবং ১৫ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। তার এই ধারাবাহিক সাফল্য এবং তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার পুরস্কার হিসেবেই তিনি আজ বাংলার শীর্ষ পদে।
অমিত শাহ বিজয়ী ভাষণ ও সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বাম আমল থেকে বাংলায় যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে তা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। মানুষ ভোট দিতে পারছিল না। আমরা সেই ভয়ের শাসনের বিনাশ ঘটিয়েছি। এটি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শের সরকার।’
দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নতুন মুখ
প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং আঞ্চলিক সমীকরণ মেলাতে বিজেপি রাজ্যে দুজন উপ-মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করতে চলেছে। গত দুই দশকে পশ্চিমবঙ্গে কোনো উপ-মুখ্যমন্ত্রী ছিল না। এই পদের জন্য আসানসোল দক্ষিণ থেকে বিজয়ী অগ্নিমিত্রা পল এবং শিলিগুড়ির বিধায়ক শংকর ঘোষের নাম চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। অগ্নিমিত্রা পল উপ-মুখ্যমন্ত্রী হলে রাজ্যে দীর্ঘ সময় পর কোনো নারী এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হবেন। উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে শংকর ঘোষের নাম আসায় পাহাড়ে ও ডুয়ার্সে খুশির হাওয়া বইছে।
শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি
শনিবার বেলা ১১টায় কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন এবং বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা।
বৃহস্পতিবার রাজ্যপাল আরএন রবি বর্তমান বিধানসভা ভেঙে দিয়ে নতুন সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত করেন। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে এই জয়কে বিজেপির জন্য পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এনডিটিভি/এসএন