শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনে আদালতে বক্তব্য দিয়েছেন গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ চার কর্মকর্তা।
বৃহস্পতিবার (৯ নভেম্বর) ঢাকায় জেলা ও দায়রা জজ শেখ মেরিনা সুলতানার তৃতীয় শ্রম আদালতে ২২ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য দাখিল করা হয়। ড. ইউনূস ও চার বিবাদীর বক্তব্য পাঠ করেন তাদের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন। এ সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্য তিন বিবাদী গ্রামীণ টেলিকমের এমডি মো. আশরাফুল হাসান, পরিচালক নুরজাহান বেগম ও মো. শাহজাহান উপস্থিত ছিলেন। বিবাদী পক্ষের লিখিত বক্তব্য গ্রহণের পর যুক্তিতর্কের জন্য আগামী বৃহস্পতিবার (১৬ নভেম্বর) দিন ধার্য করেন আদালত।
আদালত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় শ্রম আদালত ভবনের নিচে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘মানুষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করে মুনাফা করার জন্য। আমরাও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বড় করেছি। কিন্তু এসব কার্যক্রমকে আমরা সামাজিক ব্যবসা বলি। যেখানে সাধারণ মানুষের উপকার হয়। এটিই ছিল মূল বিষয়। এসব ব্যবসায় যিনি বিনিয়োগ করছেন তিনি কোনো মুনাফা নেবেন না। কাজেই আমি হচ্ছি এই সামাজিক ব্যবসার প্রবক্তা। বিশ্বব্যাপী এটি আমি প্রচার করার চেষ্টা করেছি। আমার সঙ্গে যারা আছেন তারাও মুনাফা অর্জনের জন্য দায়িত্ব পালন করেননি। কোনোটাতেই ব্যক্তিগতভাবে লাভের উদ্দেশ্য আমাদের মধ্যে ছিল না। সুতরাং যেটার উদ্দেশ্য লাভবান হওয়া নয়, সেটা আমি কার জন্য নেব, কাকে দেব? আমার উদ্দেশ্য ছিল মালিকানামুক্ত থাকব। সে জন্য কোনো কিছুতেই আমি মালিক হইনি। যেখানে আমি নিজেই মালিকানামুক্ত থাকতে চাই, সেখানে আমি আরেকজনের কাছ থেকে কেড়ে আনব কেন?’
এরপর ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘নোবেল বিজয়ী এবং বিশ্বব্যাপী সম্মানীয় প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার সহযোগী তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো দালিলিক প্রমাণ দিতে পারেনি বাদীপক্ষ। আইন লঙ্ঘনের কোনো বিষয় থাকলে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার বিধান রয়েছে। যেখানে মামলায় বলা হচ্ছে কোম্পানিটির পরিচালনা বোর্ডে ১২-১৩ জন রয়েছেন। অথচ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা করা হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজনের বিরুদ্ধে। বাদীপক্ষ স্বীকার করেছে এই চার বিবাদীর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো মামলা চলতে পারে না।’
এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখানে নোবেল বিজয়ীর বিচার হচ্ছে না। ব্যক্তির অপরাধের বিচার হচ্ছে। বিবাদী পক্ষ মূল মামলা থেকে মনোযোগ সরাতে এসব কথা বলছেন। বিবাদী পক্ষ মামলাটি বাতিল চেয়ে একাধিকবার হাইকোর্টে গিয়েছে। মামলায় কোনো ঘাটতি থাকলে হাইকোর্টেই তা বাতিল হয়ে যেত। আগামী ধার্য দিনে যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে সব কিছু পরিষ্কার হবে।’
আইনজীবীসহ ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বিবাদীরা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আদালতে আসেন। পৌনে ১২টার দিকে এ মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে ব্যারিস্টার মামুন প্রস্তুতির জন্য সময় চাইলে আদালত ১০ মিনিট বিরতি দেন। শ্রম আইনের ৩৪২ ধারায় ড. ইউনূসসহ চার বিবাদীর লিখিত বক্তব্য ১২টা ৫ মিনিটে উপস্থাপন শুরু করেন ব্যারিস্টার মামুন। বেলা পৌনে ৩টা নাগাদ চলে বক্তব্য পাঠ। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান যুক্তিতর্কের জন্য আগামী রবিবার দিন ধার্য করতে আদালতকে অনুরোধ করেন। তবে যুক্তিতর্ক ১৫ দিন পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন ব্যারিস্টার মামুন। তবে আদালত ১৬ নভেম্বর দিন ধার্য করেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিকদের পক্ষে অর্জিত ছুটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন পাওনা পরিশোধ করা হয়নি মর্মে দাবি করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আইনের ১১৭ ধারায় অর্জিত ছুটির সকল পাওনা ব্যাংকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া যেহেতু কোম্পানি আইনে গ্রামীণ টেলিকম চুক্তির মাধ্যমে সব কার্যক্রম চালিয়েছে। সেখানে কর্মচারীদেরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে এ মামলায় দাবি করা অন্যান্য পাওনা অযৌক্তিক।
আ.রহিম