‘নির্বাচনের ট্রেন যাত্রা শুরু করেছে। এটা আর থামবে না। কিন্তু যেতে যেতে আমাদের অনেকগুলো কাজ সেরে ফেলতে হবে। এই ট্রেন শেষ স্টেশনে কখন পৌঁছাবে, সেটা নির্ভর করবে কত তাড়াতাড়ি আমরা তার জন্য রেললাইনগুলো বসিয়ে দিতে পারি আর তা হবে রাজনৈতিক দলসমূহের ঐকমত্যের মাধ্যমে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১০০ দিন উপলক্ষে রবিবার (১৭ নভেম্বর) জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী নির্বাচন, সংস্কার ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে এসব কথা বলেন।
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা, গুম, হত্যার বিচারের আশ্বাস দেন, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত আনার কথা বলেন। তিনি বলেন, সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা চলছে। প্রধান উপদেষ্টা ভাষণে জাতীয় নির্বাচন কবে হবে, সংস্কার, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহতদের পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসন পরিকল্পনার কথাও বলেন।
তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, গুমের বিচার হবে- কারও সাধ্য নেই এটা ঠেকানোর। গুমের অভিযোগ জানালেও আপনাদের গায়ে আবার হাত দিতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, বিগত সরকার পুলিশকে দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করেছে। তিনি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
সরকারপ্রধান আরও বলেন, বিচার বিভাগকে ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত করার চেষ্টা চলছে, সফলতার সঙ্গে বন্যা মোকাবিলা, পণ্যের দাম কমানোর চেষ্টা ও রমজানে পণ্যের দাম কম রাখতে কাজ চলছে। জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়েছে, ওয়েবসাইটে সরকারের তথ্য প্রকাশ, হজের খরচ কমানো, পরিবেশ দূষণ রোধ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দিল্লি থেকে ২০ জন রাষ্ট্রদূত আসছেন বৈঠক করতে। ২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ শোধ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা, শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন, রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসছেন বলেও জানান তিনি।
জাতীয় নির্বাচন কবে হবে
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচন কবে হবে এই প্রশ্ন সবার মনে। নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছি। কয়েক দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন গঠন করার পর নির্বাচন আয়োজন করার সব দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তাবে। নির্বাচনি সংস্কারের সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে খুব দ্রুত নির্বাচনের রোডম্যাপও পেয়ে যাবেন। কিছু অত্যাবশ্যকীয় সংস্কারকাজ শেষ করেই কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন আয়োজন করব। সংস্কারের জন্য নির্বাচনকে কয়েক মাস বিলম্বিত করা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর।’
তিনি আরও বলেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হবে, যা অবাধ নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কমিশনের সুপারিশমালা অত্যন্ত জরুরি। তাদের প্ল্যাটফর্মে যান। আপনার মতামত খোলাখুলিভাবে তুলে ধরুন। আপনি দেশের মালিক। আপনি বলে দিন আপনি কী চান। কীভাবে চান।’
সংস্কার
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমি নিশ্চিত নই, সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ আমরা কতটুকু পাব। রাষ্ট্র ও সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যেই সংস্কার কমিশনগুলো তাদের সুপারিশমালা সরকারের কাছে পেশ করতে পারবে। সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতেই আমরা সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করব।’
শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা হবে
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আহত-নিহতদের স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাকেও ভারত থেকে ফেরত চাইব। বিপ্লব চলাকালে প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-শ্রমিক-জনতার শহিদি মৃত্যু হয়। আহত হয়েছেন ১৯ হাজার ৯৩১ জন। আরও নতুন শহিদের তথ্য যোগ হচ্ছে। প্রতিটি হত্যার বিচার আমরা করবই।’
সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা
ড. ইউনূস বলেন, ‘এ সরকারকে ব্যর্থ করার জন্য, অকার্যকর করার জন্য বিশাল অর্থে বিশ্বব্যাপী এবং দেশের প্রতিটি স্থানে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে মহাপরিকল্পনা প্রতি মুহূর্তে কার্যকর রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের নেতৃবৃন্দ যারা এ দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করে নিয়ে গেছেন, সে অর্থে বলীয়ান হয়ে তারা দেশে ফিরে আসার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তারা সফল হওয়া মানে জাতির মৃত্যু। সাবধান থাকুন।’
পুনর্বাসন পরিকল্পনা
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণ-অভ্যুত্থানে সব শহিদের পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে। একজনও বাদ যাবে না। সব আহত শিক্ষার্থী-শ্রমিক-জনতার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় সরকার বহন করবে। প্রতিটি শহিদ পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই গণ-অভ্যুত্থানের শহিদদের স্মৃতি ধরে রাখতে গঠিত ‘জুলাই শহিদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ বেশ পাকাপোক্তভাবে তাদের কাজ শুরু করেছে। এই ফাউন্ডেশনে সরকার ১০০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে।
গুমের বিচার হবে- কারও সাধ্য নেই আপনাদের গায়ে আবার হাত দেয়
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডই নয়, আমরা গত ১৫ বছরে সব অপকর্মের বিচার করব। অসংখ্য মানুষ গুম হয়েছে, খুন হয়েছে এই সময়ে। আমরা গুমের তদন্তে একটি কমিশন গঠন করেছি।’ অক্টোবর পর্যন্ত তারা ১ হাজার ৬০০ গুমের তথ্য পেয়েছেন। তাদের ধারণা, এই সংখ্যা ৩ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে। অনেকেই কমিশনের কাছে গুমের অভিযোগ করতে ভয় পাচ্ছেন এই ভেবে যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা তারা আবার আক্রান্ত হতে পারেন, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আপনারা দ্বিধাহীন চিত্তে কমিশনকে আপনাদের অভিযোগ জানান। কারও সাধ্য নেই আপনাদের গায়ে আবার হাত দেয়।
তিনি বলেন, ‘গুমের সঙ্গে জড়িতদের আমরা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবই। অভিযুক্ত যতই শক্তিশালী হোক, যে বাহিনীরই হোক, তাকে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হবে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের প্রধান কৌঁসুলি করিম খানের সঙ্গে আমার এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে কথা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কোনো সদস্য কিংবা অন্য কেউ যাতে হত্যা, গুমসহ এ ধরনের কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে না পারেন এ জন্য আমরা গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছি। জাতিসংঘ জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের তদন্ত রিপোর্ট ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দেবে।’
পুলিশকে দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করেছে
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘পতিত স্বৈরাচার সরকার পুলিশকে দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করেছে। বাধ্য হয়ে তাদের অনেকেই গণহত্যায় অংশ নিয়েছেন। খুবই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে তারা জনরোষের শিকার হয়েছেন। এতে তাদের মনোবল অনেক কমে যায়। আমরা পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে এনে তাদের আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকেও কিছু নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতিতে সহায়তা করেছে।’
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শক্তি ভয় দেখিয়েছিল তারা ক্ষমতা ছাড়লে দেশে লাখ লাখ লোক মারা পড়বে। টানা সাত দিন পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকার পরও ব্যাপক আকারে সহিংসতা এড়ানো গেছে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে অহেতুক আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিছু ঘটনাকে ধর্মীয় আবরণ দিয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা হয়েছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে নির্বাহী আদেশে এক দিন অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়, যা উৎসবের আমেজকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ই নয়, দেশের কোনো মানুষই যাতে কোনো রকম সহিংসতার শিকার না হয়, সে জন্য চেষ্টা করেছি।’
বিচার বিভাগকে ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত করা
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় সহস্রাধিক প্রসিকিউটর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ২৩ জন নতুন বিচারক। বিচার বিভাগকে ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিচারপতিদের নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দুর্নীতি ও অর্থ পাচারে অভিযুক্ত প্রভাবশালী দেড় শ ব্যক্তির তালিকা তৈরি এবং ৭৯ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। ১৫ শতাংশ হারে আয়কর পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত পরিসম্পদ, অর্থাৎ কালোটাকা সাদা করার বিধান বাতিল করা হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি মেনে ইতোমধ্যে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২-এ উন্নীত করা হয়েছে।
বন্যা মোকাবিলা
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, চলতি বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছয়টি বন্যা হয়েছে। বন্যা মোকাবিলায় দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী জনগণের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। বন্যা মোকাবিলা ও বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান এবং স্থানীয় অনুদানের মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।
পণ্যের দাম কমানোর চেষ্টা
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘বন্যা-পরবর্তী সময়ে বাজারে শাকসবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে আপনাদের কষ্ট হয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। বাজারে ডিমের সরবরাহ বাড়ানোর জন্য আমরা সাড়ে ৯ কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছি। এ জন্য প্রয়োজনীয় শুল্ক ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে ডিমের উৎপাদকরা যাতে সরাসরি বাজারে ডিম সরবরাহ করতে পারেন সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মানুষ যাতে স্বল্পমূল্যে কৃষিপণ্য কিনতে পারে সে জন্য রাজধানীসহ বিভিন্ন স্পটে সরকারি কিছু পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। বন্যার ফলে চালের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা আশা করি, বাজারে পণ্যমূল্য কমিয়ে আনতে এটা ভূমিকা রাখবে।’
রমজানে দাম কম থাকবে
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ ও দাম যাতে স্বাভাবিক থাকে এ জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ে আমাদের কোনো লুকোছাপা নেই। মূল্যস্ফীতির পূর্ণ তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি রোধে উচ্চ সুদের হার নির্ধারণসহ একাধিক নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে শস্য আমদানিতে এলসি সীমা অপসারণ এবং সরবরাহ চেইন সংক্ষিপ্ত করা।’
জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়েছে
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সামান্য হলেও জ্বালানি তেলের মূল্য কমানো হয়েছে। শিল্পকারখানায় গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন ব্যাহত না হয় এবং রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। গণশুনানি ছাড়া নির্বাহী আদেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম না বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। নেপাল থেকে পানিবিদ্যুৎ বাংলাদেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটে প্রকাশ
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘গত ১০০ দিনে আমরা আরও অনেক কল্যাণমূলক কাজ করেছি, যা এখানে স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। আমাদের সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে বিশ্বাসী। আমি তাই সরকারের সব মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছি তাদের নিজ নিজ কাজের বিস্তারিত বিবরণ নিজেদের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার জন্য। আমি আমার দপ্তরকেও বলেছি, সরকারের সব কাজের বিবরণ যাতে জনগণ জানতে পারে এ জন্য যেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।’
হজের খরচ কমানো
ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, ‘নতুন হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। তাতে হজের ব্যয় এক লাখ টাকারও বেশি কমিয়ে আনা হয়েছে। পাশাপাশি আমরা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, এ বছর সরকারি খরচে কাউকে হজে পাঠানো হবে না।’
পরিবেশ দূষণ রোধ
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা নতুন বাংলাদেশকে একটি পরিবেশবান্ধব এবং জীববৈচিত্র্যময় দেশ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। এটি তরুণদের আকাঙ্ক্ষা। আমাদের সবারই আকাঙ্ক্ষা। সেই লক্ষ্যে আমি প্রথমেই একটি ক্ষুদ্র পদক্ষেপ নিয়েছি। সমগ্র সচিবালয়ে প্লাস্টিকের পানির বোতল ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছি। ইতোমধ্যে সুপারশপগুলোতে পলিথিনের শপিং ব্যাগ ব্যবহার বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত কয়েক দশকে যে পরিমাণ নদী দূষণ হয়েছে, আমরা তা বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘বিশ্বনেতারা বাংলাদেশের সংকটময় সময়ে সহযেগিতার হাত বাড়িয়েছেন। যখন সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিই, সে সময় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিশ্বের অনেক দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে আমার বৈঠক করার সুযোগ হয়। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের প্রতি সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে যাবতীয় সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করেছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রাজিল, তুরস্ক, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, লিবিয়াসহ অনেক দেশের রাষ্ট্রদূত। দ্বিপক্ষীয় নানা সহযোগিতাসহ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির আশ্বাস তারা দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রবাসীদের কল্যাণে কাজ করছি। আমার অনুরোধে সংযুক্ত আরব আমিরাত সাজাপ্রাপ্ত ৫৭ জনসহ অন্যান্য বাংলাদেশিকে মুক্তি দিয়েছে। কয়েক দিন আগে বাকুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য যেকোনো সাহায্য লাগলে আমি যেন তাকে জানাই। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন। ১৮ হাজার বাংলাদেশি, যারা সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা মেনে চলার পরও স্বৈরাচারী সরকারের অব্যবস্থাপনার জন্য মালয়েশিয়া যেতে পারেননি, তিনি তাদের জন্য মালয়েশিয়ার দ্বার আবার উন্মুক্ত করার আশ্বাস দিয়েছেন। মালয়েশিয়া আগামী বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা আসিয়ানের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে।’
দিল্লি থেকে ২০ জন রাষ্ট্রদূত আসছেন বৈঠক করতে
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০ দেশের ২০ জন রাষ্ট্রদূত দিল্লিতে থাকেন। সাত দেশের সাত রাষ্ট্রদূত ঢাকায় আছেন। দিল্লি থেকে একসঙ্গে ২০ জন রাষ্ট্রদূতসহ মোট ২৭ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আমার সঙ্গে বৈঠক করার জন্য আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আসছেন। আগে কখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ জন রাষ্ট্রদূত একত্রিত হয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসেননি।’
অর্থনীতি সবল অবস্থানে
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘১০০ দিন আগে আর্থিক দিক থেকে আমরা যে লণ্ডভণ্ড অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম, সেটা এখন অতীত ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ১০০ দিনে অর্থনীতি সবল অবস্থানে চলে এসেছে। এটা সম্পূর্ণ নিজস্ব নীতিমালা দিয়ে হয়েছে। এখনো আমাদের বন্ধুদের কাছ থেকে যে সাহায্যের আয়োজন হয়েছে তা আসা শুরু করেনি। বন্ধু রাষ্ট্রগুলো শুধু যে আমাদের বড় বড় অঙ্কের সাহায্য নিয়ে আসছে তাই নয়, তারা এই সাহায্য দ্রুততম সময়ে নিয়ে আসবে, যা আমাদের অর্থনীতি অত্যন্ত মজবুত করবে।’
তিনি বলেন, ‘পতিত সরকার ও তার দোসররা প্রতিবছর দেশ থেকে ১২-১৫ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে। পাচার হয়ে যাওয়া এই অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভব সব ধরনের উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি। এ কাজে সফল হতে পারলে আমাদের অর্থনীতি আরও গতি পাবে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা ইতোমধ্যে ঋণ ও অনুদান হিসাবে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা আমাদের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করতে সক্ষম হবে।’
দুই বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ শোধ
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘যখন কাজ শুরু করেছি, দেশের অর্থনীতি ছিল বিপর্যস্ত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল তলানিতে। এই রিজার্ভ পরিস্থিতি উন্নতির পথে। গত তিন মাসে রিজার্ভে কোনো রকম হাত না দিয়েই প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ শোধ করেছি। জ্বালানি তেল আমদানিতে পুঞ্জীভূত বকেয়ার পরিমাণ ৪৭৮ মিলিয়ন ডলার থেকে কমিয়ে ১৬০ মিলিয়ন ডলারে এনছি।’
শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী কিছু গার্মেন্টস মালিক পালিয়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। আমরা তাদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে পেরেছি। মালিক-শ্রমিকের মধ্যে ১৮ দফার চুক্তি হয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন করতে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অক্টোবর মাসে আমাদের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ।’
রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি
সরকারপ্রধান বলেন, ‘পতিত সরকার ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি রেখে গিয়েছে, ফলে রাজস্ব আদায়ে গতি আনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে। এর মধ্যেও জুলাইয়ের নেতিবাচক অবস্থা থেকে অক্টোবর নাগাদ রাজস্ব আদায়ে পৌনে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। রাজস্ব আদায়ে গতি আনতে অন লাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে উৎসাহিত করছি।’
নতুন সহায়তা
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ইউএনডিপিসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের সঙ্গেও আমার দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে। তারাও বাংলাদেশকে নতুনভাবে এবং সর্বাত্মকভাবে সাহায্যের জন্য তাদের আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন।’
বিদেশি বিনিয়োগকারী আসছেন
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এখন থেকে আমরা আলোচনা শুরু করে দিয়েছি। সরকারের পক্ষ থেকে আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি সব ধরনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা আপনাদের একটা মজবুত অর্থনীতি দিয়ে যাব, ভবিষ্যতে চলার পথকে সহজগম্য করে যাব, নাগরিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করে যাব। বিপক্ষ শক্তি যত শক্তিশালীই হোক, নাশকতার যত রকমই উদ্ভট পরিকল্পনাই করুক, সবকিছু নস্যাৎ করার জন্য প্রস্তুত থাকুন। প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’