ইসলাম মানুষের যৌনক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য দুটি বৈধ মাধ্যম অনুমোদন দিয়েছে। একটি হলো বিবাহিত স্ত্রী। অপরটি হলো অধিকারভুক্ত যুদ্ধবন্দিনী অথবা ক্রীতদাসী। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা। যারা নিজেদের নামাজে বিনয়ী ও নম্র। যারা বাজে বা বেহুদা কথা-কাজ থেকে দূরে থাকে। যারা তাজকিয়া বা পরিশুদ্ধির ব্যাপারে কর্মতৎপর হয়। যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তবে তাদের স্ত্রীদের ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে তারা তিরস্কৃত হবে না।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত ১-৬)
বর্তমানে এই অধিকারভুক্ত দাসীর ব্যাপারটা ইসলামের নির্দেশিত কৌশল অনুসারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে আইনগতভাবে এই প্রথাকে একেবারে এই জন্য উচ্ছেদ করা হয়নি, যেন ভবিষ্যতে এই ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হলে অধিকারভুক্ত দাসী দ্বারা উপকৃত হওয়া যেতে পারে। কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় দাস-দাসী রাখার প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। ক্রমান্বয়ে ইসলাম তাদের ব্যাপারে এমন কৌশল ও যুক্তিময় পথ অবলম্বন করেছে, যাতে তারা সুযোগ-সুবিধা অর্জন করতে পারে এবং দাসপ্রথার প্রবণতা হ্রাস পায়।
দুটি মাধ্যমে এই প্রথা প্রচলিত ছিল। ১. কোনো কোনো গোত্র এমন ছিল যাদের পুরুষ ও নারীকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্রয়-বিক্রয় করা হতো। ক্রয় করা বা বিক্রি হওয়া নারী-পুরুষকেই ক্রীতদাস ও দাসী বলা হয়। মনিবের অধিকার হতো তাদের দ্বারা উপকার অর্জন করা। ২. যুদ্ধে বন্দি হওয়ার মাধ্যমে। কাফেরদের বন্দি নারীদের মুসলিম যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হতো এবং তারা দাসী হয়ে তাদের সঙ্গে জীবন-যাপন করত। বন্দিনীদের জন্য এটাই ছিল উত্তম ব্যবস্থা। কারণ তাদের সমাজে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিলে তাদের মাধ্যমে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হতো।
ইসলাম দাসপ্রথা বিলোপে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষণা না করার কারণ বর্ণনায় মিসরীয় লেখক ও গবেষক মুহাম্মদ মুসআদ ইয়াকুত তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন। যথা—১. প্রাচীনকাল থেকে দাসপ্রথা ও দাস ব্যবসা সমগ্র বিশ্বে প্রচলিত ছিল। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এর ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে আকস্মিকভাবে তা নিষিদ্ধ না করে ইসলাম এমন পন্থা অবলম্বন করেছে যেন ধীরে ধীরে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়। ২. তৎকালীন পৃথিবীর সব রাজ্য, সাম্রাজ্য ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দাসপ্রথার বৈধতার ওপর একমত ছিল। ফলে ইসলামি রাষ্ট্র নিষিদ্ধ করলেও সিদ্ধান্ত ফলপ্রসূ হতো না। ৩. দাসপ্রথা নিষিদ্ধের সঙ্গে অসহায়, বৃদ্ধ ও দুর্বল দাসদের সামাজিক ও মানবিক সুরক্ষার প্রশ্নও জড়িত ছিল। দাসদের ভরণপোষণ, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক প্রয়োজন সাধারণত মনিবদের ওপর বর্তায়। ইসলাম দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করলে বিপুলসংখ্যক মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে যেত। তাদের ভেতর বহুসংখ্যক দাস এমন ছিল, যারা নিজের দায়িত্ব গ্রহণে সক্ষম ছিল না। ফলে ইসলাম দাসপ্রথা নিষিদ্ধ না করে দাস-দাসীর অধিকার সংরক্ষণে অধিক মনোযোগী হয়েছে। দাসপ্রথাকে হ্রাস করতে ইসলামের নানামুখী উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে—১. সব মানুষের জন্য অভিন্ন মানবিক অধিকার ও মর্যাদা ঘোষণা করা হয়েছে। ২. দাসমুক্ত করা ইবাদত ঘোষণা করা হয়েছে। ৩. স্বাধীন ব্যক্তিকে দাস বানানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৪. দাসমুক্তিকে কাফফারা তথা পাপের প্রতিবিধান ঘোষণা করা হয়েছে। ৫. দাসমুক্তি পরকালীন মুক্তির উপলক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে ইত্যাদি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নানাভাবে দাসমুক্তির ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো দাস মুক্ত করল, আল্লাহ দাসের প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে তার প্রতিটি অঙ্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। এমনকি লজ্জাস্থানের বিনিময়ে লজ্জাস্থান।’ (মুসলিম, ১৫০৯)
উল্লিখিত ক্রীতদাস বা দাসী আর বর্তমান সময়ের গৃহপরিচারিকা এক নয়। বর্তমানে নানান উপায়ে গৃহপরিচারিকার সঙ্গে ক্রীতদাস বা দাসীসুলভ যেসব আচরণ বা ব্যবহারের কথা শোনা যায়, তা কোনোভাবেই ইসলামসম্মত নয়; বরং হারাম। গৃহপরিচারিকা স্বাধীন মানুষ এবং পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করা শ্রমিক। শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ ইসলামের অন্যতম একটি সৌন্দর্য। ইসলাম বৈধ পন্থায় উপার্জন করাকে সবসময় উৎসাহ দেয়। কাজ বড় হোক বা ছোট—বৈধ পন্থায় হলে অবশ্যই তা সম্মানের।
ঠুনকো অভিযোগে শ্রমিককে অত্যাচার-নির্যাতন বা মারধর করার অধিকার কিছুতেই দেয়নি ইসলাম। আবু মাসউদ (রা.) বলেন, “আমি আমার চাকরকে মারধর করছিলাম। আমি পেছন থেকে আওয়াজ শুনতে পেলাম, ‘সাবধান আবু মাসউদ! তুমি তোমার গোলামের ওপর যতটুকু ক্ষমতা রাখো, আল্লাহ তোমার ওপর এর চেয়ে বেশি ক্ষমতা রাখেন।’ আমি পেছনে ফিরে দেখি, তিনি আমার প্রাণের নবি। আমি তখন বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি তাকে আল্লাহর জন্য আজাদ করে দিলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘তুমি যদি তাকে মুক্ত না করতে; তবে অবশ্যই তোমাকে আগুনে জ্বলতে হতো।” (মুসলিম, ৯২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘এরা (অর্থাৎ চাকর-বাকর, কর্মচারী, ক্রীতদাস ইত্যাদি) তোমাদের ভাই, তোমাদের খেদমতগার। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। সুতরাং যার ভাই তার অধীন রয়েছে, তাকে যা সে নিজে খায় তা থেকে খেতে দেবে। যা সে নিজে পরে, তাই তাকে পরাবে। তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দেবে না, যা তাদের পক্ষে পালন করা অধিক কষ্টকর। আর যদি তাদের ওপর অধিক কষ্টকর কোনো কাজ চাপিয়ে দিয়ে থাক, তবে তাদের সাহায্য করো।’ (বুখারি, ২৫৪৫, মুসলিম, ১৬৬১)
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়