আল্লাহতায়ালা মানুষের বাহ্যিক রূপের পরিবর্তে অন্তরের দিকে তাকান। তাই হৃদয় বা কলবের সুস্থতা ও পরিশুদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী, অন্তর সুস্থ থাকলে পুরো শরীর সুস্থ থাকে, আর কলব অসুস্থ হলে পুরো শরীরই অসুস্থ হয়ে পড়ে। হৃদয় বা কলবের সুস্থতা বলতে অন্তর বা হৃদয়ের নির্মলতা ও সুস্থতাকে বোঝায়, যা মানুষের শারীরিক ও আত্মিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। সুস্থ হৃদয় ভালো কাজের দিকে পরিচালিত করে এবং অসুস্থ হৃদয় খারাপের দিকে টেনে নেয়। তাই হৃদয়কে সুস্থ রাখা জরুরি, যা আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি ও প্রশান্তির কারণ হয়। এক সুস্থ হৃদয়বান মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে এবং দুনিয়া-আখেরাত উভয় জায়গায় শান্তির অধিকারী হয়। তাই প্রতিদিন কিছু আমল রয়েছে যা মুমিনের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ, আলোকিত ও শক্তিশালী করে তোলে।
সুস্থ হৃদয় পেতে মুমিনের দৈনিক আমল হলো নিয়মিত আল্লাহর জিকির ও কোরআন তিলাওয়াত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, বিশেষত চাশতের নামাজ, ভালো কাজ ও সৎ চিন্তা, হালাল রিজিক ও পরিমিত জীবনযাপন এবং সর্বদা সুস্থতা, ইস্তিগফার ও নিরাপত্তার দোয়া করা।
‘কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির’ কোরআন হৃদয়ের রোগের ওষুধ। প্রতিদিন অল্প হলেও নিয়মিত তিলাওয়াত একজন মুমিনকে আত্মিক শক্তি দেয়, ভুল-ত্রুটি থেকে দূরে রাখে এবং জীবনের সঠিক পথে পরিচালিত করে। নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত এবং আল্লাহর জিকির (যেমন- সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার) করা, যা হৃৎপিণ্ডসহ পুরো শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। আল্লাহর জিকির হৃদয়কে প্রশান্ত করে, উদ্বেগ কমায় এবং পুরো দিনের আমলকে বারাকাহপূর্ণ করে তোলে।
‘নামাজ’ হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, অহংকার কমায় এবং মানুষকে আল্লাহর সামনে নম্র করে তোলে। প্রতিটি নামাজ সময়ে পড়তে পারা হৃদয়ের জন্য দারুণ এক অনুশীলন। যা তাওজিদে দৃঢ়তা, খুশু ও বিনয়, গুনাহ থেকে দূরে থাকা শিখায়। নামাজ হলো মুমিনের হৃদয়ের দৈনিক ব্যায়াম।
পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ ছাড়াও, চাশতের নামাজ আদায় করা। হাদিস অনুযায়ী, এটি শরীরের জোড়াগুলোর হক আদায় করে।
‘ভালো কাজ ও সৎ চিন্তা’ হৃদয়ের স্বাস্থ্য শুধু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভালো কাজ, সদয় আচরণ, অন্যায়-অহংকার পরিত্যাগ, পাপ থেকে দূর থাকা এবং মানুষকে কষ্ট না দেওয়া, এসবও হৃদয়কে সুস্থ ও পবিত্র রাখে।
‘হালাল রিজিক’, হালাল উপার্জন ও পরিমিত খাবার হৃদয় ও শরীরকে সুস্থ রাখে। হালাল রিজিক না হলে ইবাদতের রুচি নষ্ট হয়, হৃদয়ে কালো দাগ পড়ে। তাই একজন মুমিন দিনের আমলে হালাল কাজ, সততা ও আমানতদারিত্ব বজায় রাখে।
‘দোয়া ও ইস্তিগফার’ হৃদয়কে কলুষমুক্ত করার শক্তিশালী উপায় হলো ইস্তিগফার। এটি অহংকার দূর করে, গুনাহ মোছে, মনকে নরম করে এবং জীবনে শান্তি এনে দেয়।
‘সুস্থতা ও নিরাপত্তা’ ইমানের পর সুস্থতা ও নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় নেয়ামত। তাই সর্বদা আল্লাহর কাছে ক্ষমা, নিরাপত্তা ও সুস্থতা চেয়ে দোয়া করা।
কবি বলেন, তুমি যদি চাও, তোমার হৃদয়টা আয়নার মতো স্বচ্ছ, পরিষ্কার হয়ে যাক, তা হলে হৃদয়টাকে দশটি রোগ থেকে পরিষ্কার কর। দিলের দশ রোগ; ১. লোভ। ২. দীর্ঘ আশা। ৩. রাগ। ৪. মিথ্যা বলা। ৫. গিবত। ৬. কার্পণ্য বা কৃপণতা। ৭. হিংসা-ফাসাদ। ৮. রিয়া-লৌকিকতা। ৯. কিবর, অহংকার। ১০. কীনা, যা হিংসার কাছাকাছি অর্থাৎ মনে মনে জ্বলতে থাকা।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কিয়ামতের দিন কোনো অর্থসম্পদ এবং সন্তানসন্ততি কারও কোনো উপকারে আসবে না। একমাত্র সে ব্যক্তি মুক্তি পাবে, যে সুস্থ কলব নিয়ে আল্লাহর কাছে পৌঁছবে।’ (সুরা শু‘আরা ৮৮-৮৯)।
কিয়ামাতের দিন সুস্থ হৃদয় বা কলব ব্যতীত কেউই মুক্তি পাবে না। এ জন্য কলবের বিভিন্ন অবস্থা জেনে তার রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। সুস্থ হৃদয় থাকলে দুনিয়াতেও কোনো ভয় নেই, আখিরাতেও নেই কোনো চিন্তা। একজন মুমিনের হৃদয় শক্তিশালী, শান্ত ও পরিশুদ্ধ তখনই হয় যখন সে তার দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত ইবাদত, দোয়া, জিকির ও সৎ আচরণকে অভ্যাসে পরিণত করে। একটি সুস্থ হৃদয়ই একজন মুমিনকে প্রকৃত সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
লেখক: মুফতি ও মুহাদ্দিস
জামিয়া ইসলামিয়া মাখযানুল উলুম, ঢাকা