ইসলামি জীবনব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হলো আর্থিক জীবনব্যবস্থা। অর্থনীতি মানুষের জীবনব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। জমিন থেকে ফসল উৎপাদন, যথাযথ বণ্টন ও ন্যায়সংগত ভোগ করার যে প্রক্রিয়া তাকেই বলা হয় ইসলামি অর্থনীতি। ইসলামি অর্থনীতি মানবকল্যাণে নিবেদিত। কেননা, সুষ্ঠু সমাজ ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের পার্থিব কল্যাণ নির্ভরশীল। ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত, যা ন্যায় ও ভারসাম্যের সঙ্গে ব্যবহৃত হলে ব্যক্তি ও সমাজে কল্যাণ আসে, আর অব্যবস্থাপনা ও অন্যায় ব্যবহারে দুরবস্থা সৃষ্টি হয়।
অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ—
১. অন্যায় ও অবৈধ উপার্জন: হারাম উপার্জন, সুদ, ঘুষ ও প্রতারণা সমাজে বরকত নষ্ট করে এবং অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনে। নবিজি (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘কোনো জনপদ বা দেশে যখন জিনা-ব্যভিচার ও সুদ ব্যাপকতা লাভ করে, তখন সেখানকার অধিবাসীদের ওপর আল্লাহর আজাব আসা অনিবার্য হয়ে পড়ে।
২. অপচয় ও অপব্যবহার: অতিরিক্ত ভোগবাদ ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ব্যক্তি ও পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়।
৩. জাকাত ও অধিকার আদায়ে অবহেলা: জাকাত ও সদকা অবহেলা করলে ধনীদের সম্পদে বরকত কমে এবং সমাজে বৈষম্য বাড়ে।
অর্থনৈতিক দুরবস্থা কোনো আকস্মিক বিপর্যয় নয়; বরং এটি আমাদের চিন্তা, আমল ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির ফল। কোরআন ও হাদিস এ দুরবস্থা থেকে উত্তরণের সুস্পষ্ট পথনির্দেশনা দিয়েছে—
১. হালাল উপার্জনের প্রতি কঠোরতা: হালাল আয়ের মাধ্যমে জীবনে প্রশান্তি ও ইবাদতে মনোযোগ আসে। হারাম আয় বরকত নষ্ট করে, আর হালাল উপার্জন অল্প হলেও জীবনে প্রশান্তি আনে। রাসুল (সা.) বলেন, হালাল উপায়ে জীবিকা অন্বেষণ করা ফরজের পর আরও একটি ফরজ কাজ।
২. অপচয় ও ঋণাসক্তি পরিহার: অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও বিলাসিতা দারিদ্র্যের মূল কারণ। ইসলামি অর্থনীতি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যই হলো দারিদ্র্য বিমোচন। নবিজি (সা.) বলেছেন, দুর্বল, অসহায় ও নিঃস্বদের অসিলায় সচ্ছল মানুষরা সাহায্য ও রিজিকপ্রাপ্ত হয়। অসহায় ও বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করা, দরিদ্র আত্মীয়স্বজনকে দান করা, নিঃস্ব পথিক ও ঋণগ্রস্তদের সাহায্য করার মাধ্যমে দরিদ্রতা দূর হয়।
৩. জাকাতব্যবস্থা প্রবর্তন: অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে সমাজে বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো জাকাত। ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের মধ্যে জাকাত অন্যতম।
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত জাকাত বণ্টনের খাতগুলোয় যথাযথ বণ্টন করলে সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নতি হয়। নিয়মিত দান-সদকা ও জাকাত সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সদকা সম্পদ কমায় না।’ (সহিহ মুসলিম)
সুতরাং, জাকাত-সদকা দারিদ্র্য দূর করে, সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে।
৪. পরিশ্রম ও কর্মসংস্থান: রাসুল (সা.) নিজে কঠোর পরিশ্রম করেছেন, কখনো অপচয় করেননি। ইসলাম অলসতা নয়, শ্রম ও উদ্যোগকে উৎসাহিত করে।
৫. আদল-ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের প্রতি গুরুত্বারোপ: ইসলামি অর্থব্যবস্থায় কেউ দুর্বলদের ওপর অবিচার করতে পারে না। প্রত্যেক বৈধ মালিক স্বাধীনভাবে নিজেদের সম্পদ ভোগ করতে পারবে। ইসলামে অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ গ্রাস করা নিষিদ্ধ, তবে পরস্পরের সন্তুষ্টির মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে নিষেধ নেই।
৬. মধ্যমপন্থা অবলম্বন: ইসলামি শরিয়তে উপার্জন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা বাধ্যতামূলক করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তুমি একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না এবং অতি মুক্তহস্তও হয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত, রিক্ত হয়ে বসে থাকবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, ২৯)। রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা অর্থনীতির অর্ধেক।’
সুতরাং বোঝা গেল যে, অর্থনৈতিক দুরবস্থার মূল কারণ হলো নৈতিক বিচ্যুতি, অন্যায় উপার্জন ও দায়িত্বহীনতা। আর সমাধান হলো হালাল রিজিক, সংযম, জাকাত-সদকা, পরিশ্রম, ন্যায়বিচার ও মধ্যমপন্থা অবলম্বন। পাশাপাশি তাকওয়া ও খোদাভীতি অর্জন এবং সার্বক্ষণিক দোয়া, ইস্তেগফার ও তাওয়াক্কুল। আর এসবের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে একটি শান্ত, স্থিতিশীল ও বরকতময় জীবনব্যবস্থা। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে আমল করার তৌফিক দান করুন, আমিন।
লেখক: মুফতি ও মুহাদ্দিস
জামিয়া ইসলামিয়া মাখযানুল উলুম, ঢাকা