আধুনিক অর্থব্যবস্থায় ডেবিট কার্ড একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। সরাসরি নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি এড়াতে এবং লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে এর জুড়ি নেই। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে ডেবিট কার্ড তৈরি ও ব্যবহার করা মূলত বৈধ। কারণ এতে ক্রেডিট কার্ডের মতো সুদের পূর্বশর্ত থাকে না। গ্রাহক তার অ্যাকাউন্টে জমা থাকা অর্থই কেবল খরচ করতে পারেন। তবে এই কার্ড ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন পণ্য বা সেবার ওপর যে ‘ডিসকাউন্ট’ বা বিশেষ ছাড় পাওয়া যায়, তার শরয়ী হুকুম নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে।
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ মূলত ব্যাংককে দেওয়া একটি ঋণ হিসেবে গণ্য হয়। শরিয়তের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো— যে ঋণ কোনো অতিরিক্ত সুবিধা টেনে আনে, তা-ই সুদ। এই মূলনীতির আলোকেই ডেবিট কার্ডের ডিসকাউন্টকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
১. ব্যাংকের পক্ষ থেকে ছাড়: যদি কোনো ডিসকাউন্ট সরাসরি ব্যাংক প্রদান করে, তবে তা গ্রহণ করা নাজায়েজ। কারণ, ব্যাংক এই সুবিধাটি দিচ্ছে তার কাছে গ্রাহকের টাকা জমা থাকার কারণে, যা সরাসরি সুদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
২. দোকান বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ছাড়: কেনাকাটার সময় বিক্রেতা বা রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ যদি নিজ উদ্যোগে ডেবিট কার্ডের ওপর ছাড় দেয়, তবে তা গ্রহণ করা জায়েজ। এটি তাদের পক্ষ থেকে সৌজন্য বা উপহার (হেবা) হিসেবে গণ্য হবে।
৩. কার্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের ছাড়: ভিসা বা মাস্টারকার্ডের মতো নেটওয়ার্ক প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ছাড় পেলে দেখতে হবে তাদের আয়ের উৎস মূলত হালাল কি না। অধিকাংশ লেনদেন বৈধ হলে সেই ছাড় গ্রহণ করা যেতে পারে।
অনেক সময় ডিসকাউন্টটি আসলে কোন পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে, তা সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন অস্পষ্টতার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করে তা পরিহার করাই উত্তম। তবে ইসলামি শরীয়াহ মোতাবেক পরিচালিত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে ভিন্ন নিয়ম প্রযোজ্য। সেসব ব্যাংকের লেনদেন ও অফারসমূহ বিশেষজ্ঞ আলেমদের দ্বারা তদারকি করা হয়। ফলে আলেমদের নির্দেশিত নীতি অনুসরণ করে ইসলামি ব্যাংকের কার্ডে প্রাপ্ত ডিসকাউন্ট গ্রহণ করা বৈধ।
অর্থনৈতিক লেনদেনে কেবল লাভের হিসাব নয়, বরং ইমানি পবিত্রতা রক্ষা করা মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। তাই কেনাকাটায় ছাড় পাওয়ার আকর্ষণের চেয়ে সেই ছাড়ের উৎসটি বৈধ কি না, তা যাচাই করা জরুরি। আল্লাহতায়ালা আমাদের হালাল উপার্জনের পথে পরিচালিত করুন এবং সকল প্রকার পরোক্ষ সুদ থেকে হেফাজত করুন। (আমিন)।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক