আজকের দিনে ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকসহ নানা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম মানুষের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। বাংলাদেশেই প্রায় ৫ কোটি মানুষ এগুলো ব্যবহার করেন। এই বিশাল ডিজিটাল দুনিয়ায় একজন মুসলমান কীভাবে চলবেন–এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে কোরআন, হাদিস ও ইসলামি ফিকাহের আলোকে।
ইসলামে প্রযুক্তি ব্যবহারের মূলনীতি
ইসলামি ফিকাহের একটি মৌলিক নীতি হলো–যেকোনো বিষয় মূলত বৈধ, যতক্ষণ না কোরআন বা সহিহ হাদিস দ্বারা তা নিষিদ্ধ প্রমাণিত হয়। ফিকাহের ভাষায় এটিকে ‘ইবাহাতুল আসলিয়্যাহ’ বলা হয়। তাই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিজেই হারাম নয়; বরং এটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর বিধান নির্ভর করে। (ইমাম সুয়ুতি, আল-আশবাহ ওয়ান-নাজায়ির, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)
কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, মানুষ যা-ই বলুক না কেন, তা লিপিবদ্ধ হয় এবং এর হিসাব দিতে হবে। এই আয়াত আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিটি পোস্ট, মন্তব্য ও শেয়ার নিয়ে সতর্ক থাকার শিক্ষা দেয়। কারণ অনলাইনে লেখা বা ছড়ানো কথাও কথার মধ্যে পড়ে এবং এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। (সুরা কাফ, ১৮)
হাদিসের আলোকে কথা ও প্রচারের দায়িত্ব
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। (বুখারি, ৬০১৮; মুসলিম, ৪৭)
এই হাদিস সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য। অর্থহীন, মিথ্যা বা ক্ষতিকর কোনো কিছু শেয়ার না করে চুপ থাকাটাই উত্তম।
অন্য একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, মানুষ যা শোনে তাই প্রচার করা মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। (আবু দাউদ, ৪৯৯২)
সোশ্যাল মিডিয়ায় যাচাই না করে কোনো খবর শেয়ার করা এই হাদিসের সরাসরি লঙ্ঘন। কোরআনও আমাদের নির্দেশ দিচ্ছে, কোনো ফাসিক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসলে তা যাচাই করে নাও, যাতে না জেনে কাউকে কষ্ট না দেওয়া হয়। গুজব ছড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (সুরা হুজুরাত, ৬)
গিবত, মিথ্যা ও অশ্লীলতা প্রচার নিষিদ্ধ
সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের দোষচর্চা করা বা কারও ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা গিবত বা পরনিন্দার অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে গিবতকে মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার মতো ঘৃণ্য কাজ বলা হয়েছে। কারও ছবি, ভিডিও বা তথ্য সম্মতি ছাড়া প্রকাশ করাও এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ে। (সুরা হুজুরাত, ১২)
অশ্লীল কনটেন্ট দেখা বা ছড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। কোরআনে মুমিনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করতে। ইমাম নববি (রহ.) বলেছেন, চোখ দিয়ে হারাম দেখাও গুনাহ, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় হারাম কনটেন্ট স্ক্রল করার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। (সুরা নুর, ৩০-৩১; রিয়াদুস সলিহিন)
আরো পড়ুন: হারাম শরিফে একটি গুনাহ কি এক লাখ গুনাহর সমান?
সময় নষ্ট করা ও আসক্তির ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুটি নিয়ামত এমন আছে যে বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত–সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়। (বুখারি, ৬৪১২)
ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীনভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটানো এই মূল্যবান নিয়ামতের অপচয়। ইসলামি ফিকাহের দৃষ্টিতে এমন কাজে এতটাই মেতে থাকা যা নামাজ, পরিবার ও দ্বীনি দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়–তা মাকরুহ থেকে হারামের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬)
সোশ্যাল মিডিয়ার সুযোগ ও কল্যাণ
সোশ্যাল মিডিয়া ইসলাম প্রচারের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো ভালো বিষয়ের দিকে মানুষকে পথ দেখায়, সে ওই কাজকারীর সমান সওয়াব পাবে। (মুসলিম, ১৮৯৩)
তাই কোরআনের আয়াত, সহিহ হাদিস ও ইসলামের সৌন্দর্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া দাওয়াতি কাজের মধ্যে পড়ে এবং এতে বিশাল সওয়াব রয়েছে।
এছাড়া পরিবার ও আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা সিলাতুর রাহিম বা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সোশ্যাল মিডিয়া এই বন্ধন টিকিয়ে রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। (বুখারি, ৫৯৮৪; মুসলিম, ২৫৫৬)
মুসলিমের করণীয়
ইসলামি পণ্ডিতরা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কিছু মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন, কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে যাচাই করতে হবে। অশ্লীল, মিথ্যা বা বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট থেকে দূরে থাকতে হবে। নামাজ, পরিবার ও দায়িত্বের ক্ষতি না হয় এমনভাবে সময় নির্ধারণ করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়াকে জ্ঞান অর্জন ও দাওয়াতের কাজে লাগাতে হবে। (ফাতাওয়া মুআসিরা)
আরো পড়ুন: কোরবানির ছুরি তোলার আগে যা জানতে হবে
সোশ্যাল মিডিয়া নিজে না ভালো, না মন্দ–এটি একটি হাতিয়ার মাত্র। কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে এটি ইবাদতের মাধ্যম হতে পারে, আবার গুনাহর পথও হতে পারে। কোরআনে আল্লাহ বলেন, কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলে তা দেখবে, আর কেউ অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করলে তাও দেখবে। (সুরা জিলজাল, ৭-৮)
তাই একজন মুসলিম হিসেবে প্রতিটি পোস্ট, শেয়ার ও মন্তব্যের আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করা উচিত–এই কাজে কি আল্লাহর সন্তুষ্টি আছে? এই সচেতনতাই পারে আমাদের ডিজিটাল জীবনকে ইসলামসম্মত করে তুলতে।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক