আমাদের দেশের ওয়াজ-মাহফিল বা লোকমুখে একটি কথা বেশ প্রসিদ্ধ যে, বিদায় হজের ভাষণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাহাবিরা তাদের ঘোড়া নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। বলা হয়, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন বললেন, ‘উপস্থিত ব্যক্তিরা যেন অনুপস্থিতদের কাছে আমার বার্তা পৌঁছে দেয়’ তখন সাহাবিরা যার ঘোড়ার মুখ যেদিকে ফেরানো ছিল, সেদিকেই দ্বীন প্রচারের নেশায় বেরিয়ে পড়েন।
শুনে আবেগাপ্লুত হলেও, ইসলামের ইতিহাস ও যুক্তির আলোকে এই কথাটি সঠিক নয়। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই ভাষণটি দিয়েছিলেন আরাফাতের ময়দান এবং কোরবানির দিন (১০ জিলহজ)। শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, তখনো হজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ (যেমন- তাওয়াফে জিয়ারত, মিনায় অবস্থান, কঙ্কর নিক্ষেপ ইত্যাদি) বাকি ছিল। হজ সম্পন্ন না করে সাহাবিদের পক্ষে এভাবে চলে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
আরো পড়ুন: ইহরাম অবস্থায় কাবার গিলাফ ধরা যাবে কি?
ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী, হজের পর হাজার হাজার সাহাবি নবি করিম (সা.)-এর সঙ্গেই মদিনা মুনাওয়ারায় ফিরে এসেছিলেন। তারা সবাই সেখান থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাননি। সাহাবিরা দ্বীন প্রচারের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন–এটি সন্দেহাতীতভাবে সত্য। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাদের পদচিহ্ন এর প্রমাণ। তবে ‘ভাষণ শেষেই ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যাওয়া’র এই বর্ণনাটি মূলত দ্বীনের জন্য তাদের কোরবানি বোঝাতে গিয়ে কেউ কেউ অতিরঞ্জন করে ফেলেছেন। সহিহ হাদিস বা নির্ভরযোগ্য সীরাত গ্রন্থে এর কোনো ভিত্তি নেই।
আরো পড়ুন: আপনিও কি এই ভুলটি করছেন?
দ্বীন প্রচারের ক্ষেত্রে সাহাবিদের অসংখ্য সহিহ ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনা ইতিহাসে বিদ্যমান। সেগুলো প্রচার করাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবিদের নামে এমন কোনো কথা বলা উচিত নয়, যা বাস্তবসম্মত নয় বা দালিলিক ভিত্তি নেই। মনে রাখা জরুরি, দ্বীনের নামে প্রতিটি অসত্য বা ভিত্তিহীন কথার জন্য আমাদের আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সঠিক ইতিহাস জানার ও প্রচার করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক