সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাওয়ায় গ্রাহকদের মাঝে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই কেটে গেছে। ফলে ব্যাংক থেকে এতদিন আমানতের টাকা তোলার যে হিড়িক ছিল, তাও ধীরে ধীরে কমে এসেছে। অর্থাৎ হাতে ধরে রাখা নগদ টাকা আবার ব্যাংকে ফিরতে শুরু করেছে। ফলে ব্যাংকের আমানত বাড়ছে, তবে তা ধীরগতিতে।
জানা গেছে, ব্যাংকিংব্যবস্থায় নানা ধরনের অনিয়মে গ্রাহকদের মাঝে এমনিতেই আস্থাহীনতা তৈরি হয়। এরপর সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে ব্যাংক থেকে আমানতের টাকা তোলার চাপ বাড়ে। এতে মানুষের হাতে টাকা ধরে রাখার পরিমাণ বাড়ে, অন্যদিকে ব্যাংকের আমানত কমতে থাকে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নানামুখী উদ্যোগে ব্যাংক খাতের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা আবার বাড়তে শুরু করেছে। এতে মানুষের হাতে ধরে রাখা নগদ টাকা আবার ব্যাংকে ফিরতে শুরু করেছে, সেই সঙ্গে ব্যাংকের আমানতও বাড়ছে। তবে সেটা কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৭৬ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমানত বেড়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর ৬ মাসে বেড়েছে ৩৪ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। গত জুন শেষে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৪২ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। তবে জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমানতের প্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিক হারে কমে গিয়েছিল। অক্টোবর থেকে তা আবার বাড়তে থাকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকার প্রবৃদ্ধি কমে হয়েছে ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এ সময় মানুষের হাতে ধরে রাখা নগদ টাকার পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা, যা জুলাই শেষে ছিল ২ লাখ ৯১ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ৫ মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকা কমেছে ১৫ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা। আর আগের মাসের তুলনায় কমেছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে অব্যাহতভাবে অনিয়ম-দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় দেশের ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থার মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, যা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। যে কারণে ব্যাংকের আমানত বাড়ছে। তবে ধীরগতির কারণ হিসেবে তারা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক মানুষ ব্যাংকে থাকা নিজেদের সঞ্চয় ভেঙে ফেলেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের সাম্প্রতিক অস্থিরতা। অর্থনৈতিক মন্দার কারণেও ব্যাংকের আমানত সেভাবে বাড়ছে না। জীবনযাপনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষের হাতে সঞ্চয় থাকছে না। ব্যাংকের আমানত বাড়ার গতি ধীর হওয়ার পেছনে এটিরও ভূমিকা রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠনের প্রভাবে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে ধরে রেখেছে। ফলে আমানত অস্বাভাবিক হারে কমে গিয়েছিল। আর ব্যাংকের বাইরে রাখা টাকার পরিমাণ বাড়ছিল। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা উদ্যোগে ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। ফলে গ্রাহকদের মধ্যে যারা অতিরিক্ত টাকা তুলেছিলেন, সেই টাকা আবার ব্যাংকে রাখতে শুরু করেছেন। আবার সুদের হার বাড়ায় নতুন আমানতও ব্যাংকে আসছে। তবে সেটার পরিমাণ খুব বেশি না। কারণ দীর্ঘদিন ধরে মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। ফলে সঞ্চয় করার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকের আমানতও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না। আমানত না বাড়লে বিনিয়োগ বাড়বে না। আর বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না, আয় বাড়বে না, সঞ্চয়ও বাড়বে না। ফলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হবে। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর জোর দেন তিনি।
জানা গেছে, মেয়াদি আমানত হলো দেশের ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের প্রধান উৎস। দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ৮৮ শতাংশই মেয়াদি। গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত এ অর্থ থেকেই ঋণ বিতরণ করা হয়। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৭৬ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ডিমান্ড বা তলবি আমানত। বাকি ১৫ লাখ ৭৮ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা বিভিন্ন মেয়াদের। এ ধরনের আমানতের সর্বনিম্ন মেয়াদ তিন মাস। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ডিসেম্বর শেষে মেয়াদি এবং তলবি উভয় ধরনের আমানতের পরিমাণ বেশ কিছুটা বেড়েছে।
জানা গেছে, সামগ্রিকভাবে আমানত প্রবৃদ্ধির দিক থেকে ব্যাংকগুলোর জন্য গত দুই বছর একদমই ভালো যায়নি। ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানত ছিল ১৪ লাখ ৯ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে তা ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ১৬৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৩ সাল শেষে ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। আর ২০২৪ সাল শেষে আমানতের পরিমাণ হয়েছে ১৭ লাখ ৭৬ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ২০২২ সাল বাংলাদেশসহ বিশ্ব অর্থনীতি বিভিন্নমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে পার করেছে, যা ২০২৩ সালেও বহাল ছিল। আর ২০২৪ সালে সেই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সংকট। সংকটগুলোর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের ব্যাংক খাতের আমানতের ওপরও। এ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বিক্রি, কয়েকটি ব্যাংকের নাজুক পরিস্থিতির খবর প্রকাশে ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থাহীনতায় আমানত প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। তবে বর্তমান গভর্নরের নানামুখী উদ্যোগে আবার ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ব্যাংকের আমানতও। সুদহার বাড়ায় ব্যাংকের আমানত ধীরে ধীরে বাড়ছে। আশা করি আগামীতে তা আরও বাড়বে।