চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-এর সঙ্গে বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানাবেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ ও ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ জানাবেন। ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনার আহ্বানও জানাবেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার পর ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে চীনের বাজারে বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস চীনের প্রেসিডেন্টের কাছে শুল্কমুক্ত সুবিধা না থাকলেও বাংলাদেশ-চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানোর ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা করবেন। বিশেষভাবে চীন থেকে শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানি ও বাংলাদেশ থেকে রপ্তানির ক্ষেত্রে কী সুবিধা দেওয়া যায় তা নিয়েও আলোচনা করবেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে তাদের কারখানা স্থানান্তর করার আহ্বান জানাবেন ড. ইউনূস। বৈঠকে বাংলাদেশের শ্রমিকের কম মজুরি, বিনিয়োগ বাড়াতে বর্তমান সরকারের দেওয়া বিভিন্ন সুবিধার কথাও তুলে ধরবেন।
গত মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি চার দিনের সফরে চীন যাচ্ছি। প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে আমার বৈঠক হবে। চীনের বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সিইওদের সঙ্গেও বৈঠক করব। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ চাইনিজ সোলার প্যানেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লংজি বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের আগ্রহ জানিয়েছে। আমি তাদের সঙ্গে বৈঠক করব। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত সহায়তা, মেডিকেল সহায়তা, স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসহ অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হবে। তারা আমাদের দেশ থেকে আম, কাঁঠাল ও পেয়ারা আমদানি করতে চায়। এটা খুব দ্রুতই শুরু হবে।’
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিল্প-বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার হবে। বাংলাদেশ হবে চীনের বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত দেশ। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করবে। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছে।
চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি করা পণ্যের মধ্যে মূলধনি যন্ত্রপাতিই বেশি। বাংলাদেশ অন্যতম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ আর পোশাক তৈরির বেশির ভাগ কাঁচামাল আসে চীন থেকে। এ ছাড়া বয়লার, তুলা, ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ, প্লাস্টিক, সুতা, লৌহ, ইস্পাত ইত্যাদি পণ্যও আমদানি করা হয় চীন থেকে। চীন থেকে মোবাইল ফোন, উন্নতমানের পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, খেলনা, ডায়াপার, খাদ্যদ্রব্য, কাঁচামাল, প্রসাধনী, ঘরের আসবাবপত্র, রাসায়নিক, বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র, জামাকাপড়, জুতা, ব্যাগ, শুকনো খাবার, ঘর সাজানোর বিভিন্ন সামগ্রীসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যসামগ্রী বেশি আমদানি করা হয়। বিভিন্ন ধরনের গৃহসামগ্রীর মধ্যে রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, রান্নাঘরে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী আমদানি হয়। বাংলাদেশের স্বল্পমূল্যে আকর্ষণীয় মোবাইল ফোনের কেস উৎপাদনের ব্যবস্থা না থাকায় চীন থেকেই বেশি আমদানি হয়। নিজস্ব ব্যবহারের জন্য অথবা ব্যবসার উদ্দেশ্যে ছোট-বড় বিভিন্ন আকর্ষণীয় মজবুত আসবাবপত্রও চীন থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের শুকনো খাদ্যদ্রব্য যেমন বাদাম, খেজুর, বিভিন্ন ধরনের স্ন্যাকস এবং ফ্রোজেন খাদ্যসামগ্রী, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, গম ইত্যাদি আজকাল চায়না থেকে আমদানি করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি। বাংলাদেশে চীন থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্যসামগ্রী আমদানির বিপরীতে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্যসামগ্রী রপ্তানি করে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত দুই দেশের বাণিজ্য ব্যবধান কমিয়ে আনতে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সঙ্গে বৈঠকে চীনের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ থেকে আম, পাট ও পাটজাত পণ্য আর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বেশি পরিমাণে আমদানি করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার অহ্বান করেছে। বাংলাদেশে চীনের পণ্য প্রদর্শনীর আয়োজন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাণিজ্য প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা চান। এসব বৈঠকে চীনের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। এফটিএ হলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে বলেও এসব বৈঠকের
আলোচনায় উঠে এসেছে। জানা গেছে, বিশ্বের ২৯টি দেশের সঙ্গে ২২টি এফটিএ করেছে চীন, যার মধ্যে উন্নয়নশীল ও উন্নত দুই ধরনের দেশই আছে।
২০২০ সালে ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় চীন। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ৯৮ শতাংশ। আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশের জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা চালু করবে দেশটি।
বাণিজ্য উপদেষ্টা খবরের কাগজকে বলেন, আমাদের দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করেছে চীন। এর মাধ্যমে চীনের সঙ্গে এ দেশের সম্পর্কে অনন্য মাত্রা যোগ হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার এই সফরের মধ্য দিয়ে চীনের সঙ্গে শিল্প ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশ চীন বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এবারের সফরে আশা করছি দেশের জন্য ভালো হবে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পদক্ষেপ নেওয়া হলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশের প্রাপ্ত শুল্কমুক্ত সুবিধায় চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, চীন যেসব পণ্য আমদানি করে- আমাদের সেসব পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমাদের চীন থেকে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা উচিত।