ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার পাড়াগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুল মোতালেব সৌদি খেজুর চাষে হয়েছেন কোটিপতি। সৌদিতে কাজ শিখে দেশে ফিরে গড়ে তোলেন খেজুরবাগান। এখন ৭ বিঘায় ৩ হাজারের বেশি গাছ। বছরে আয় ৫০ লাখ টাকা। চারা বিক্রি হয় লাখ টাকায়। তার সাফল্যে এলাকায় গড়ে উঠেছে আরও বাগান।
সরেজমিন দেখা গেছে, বিশাল খেজুরবাগানে গাছে গাছে ঝুলছে পাকা খেজুর। ছোট গাছের ফল যেন মাটি ছুঁতে চাইছে। উঁচু গাছের খেজুর পাড়তে লোহার মই বানানো হয়েছে। কেউ খেজুর কিনতে আসছেন, কেউ চারা। বাগানে আসা সবাইকে বিনামূল্যে খেজুর খাওয়াচ্ছেন কৃষক আব্দুল মোতালেব। চারা কিনলে লাগানো ও পরিচর্যার কৌশলও শেখাচ্ছেন তিনি।
মোতালেবের একসময় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাটির ঘরে থাকতেন। এখন বাগানের আয়ে করেছেন দুই তলা বাড়ি, কিনেছেন কয়েক বিঘা জমি। যার দাম কোটি টাকার বেশি। স্থানীয়দের কাছে তিনি এখন ‘কোটিপতি খেজুর মোতালেব’। মরুভূমির খেজুর দেশে চাষ করে সাফল্য পেয়ে অনেক বেকার যুবকের অনুপ্রেরণা হয়েছেন তিনি। এখন নিয়মিতই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন চারা কিনতে। মৌসুমে খেজুর কিনতেও ভিড় হয়। অনেকে কেবল বাগান দেখতেও আসেন।
১৯৯৮ সালে সংসারের অভাব ঘোচাতে সৌদি আরবে পাড়ি জমান মোতালেব। সেখানে তিন বছর খেজুরবাগানে কাজ করেন। সেখান থেকেই চাষের কৌশল শেখেন। দেশে ফিরে ২০০১ সালের শেষে ৩৫ কেজি উন্নত জাতের খেজুরের বীজ নিয়ে আসেন। আঙিনায় ২ বিঘা জমিতে রোপণ করেন ২৭৫টি চারা। বেশির ভাগ গাছই পুরুষ হয়ে যায়, ফলে ফলন হয় না। কয়েকবার চেষ্টা করেও একই অবস্থা হয়। তৃতীয়বার দুই গাছে খেজুর হয়। পরে সাতটি মাতৃগাছ পান। বাকিগুলো পুরুষ গাছ। পুরুষ গাছ কেটে মাতৃগাছ থেকে কাটিং করে চারা উৎপাদন শুরু করেন। হতাশা কাটিয়ে সাফল্য আসে। প্রায় আড়াই দশকে তার সাফল্য বড় হয়। তার পথ অনুসরণ করে এলাকায় ছোট-বড় বহু খেজুরবাগান গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘লোকে বিদেশে গেলে স্যুটকেস ভর্তি জিনিস নিয়ে আসে। আর মোতালেব এনেছিলেন খেজুরের বীজ। তখন অনেকে হাসাহাসি করত, পাগল বলত। কারণ সবার ধারণা ছিল, সব মাটিতে খেজুর হয় না। কিন্তু মোতালেব প্রমাণ করেছেন, ধারণা ভুল। এখন বাগান থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করছেন তিনি। নতুন চাষিদের কাছে তিনি আইডল।’
২০০৮ সালের শেষে মোতালেবের কাছ থেকে শেখা কৌশলে দুই বিঘা জমিতে বীজ বপন করেছিলেন গ্রামের আফাজ পাঠান। সেই থেকে তারও সাফল্য আসে। খেজুর আর চারা বিক্রি করে আয় করছেন কোটি টাকা।
আফাজ পাঠান বলেন, ‘প্রথম বছরই ৬ হাজার চারা হয়। এর মধ্যে মাতৃগাছ হয় ১৩০টি। এখন ৩ হাজার ৫০০ মাতৃগাছ আছে। পুরুষ গাছ ৫০০। বর্তমানে ১০ বিঘায় খেজুরবাগান। বছরে আয় হয় ৩০ লাখ টাকার বেশি।’
মোতালেব বলেন, ‘মনোবল দৃঢ় করে চাষ শুরু করেছিলাম। সৌদিতে শেখা কৌশল কাজে লাগিয়েছি। এখন ৭ বিঘা বাগানে ৩ হাজারের বেশি আজোয়া, শুক্কারি, আম্বার, লিপজেল ও মরিয়ম জাতের গাছ আছে। বছরে আয় হয় ৫০ লাখ টাকার বেশি। রসের জন্য আরও ৭ বিঘায় ৮ হাজার গাছ নিয়ে নতুন বাগান করেছি।’
তিনি জানান, বছরে একেক গাছে ৫০-৬০ কেজি ফল হয়। পূর্ণবয়স্ক গাছে ২৫০ কেজি পর্যন্ত ধরে। আজোয়া জাতের খেজুর প্রতি কেজি ৩ হাজার টাকা, আম্বার ২ হাজার ৫০০, শুক্কারি ১ হাজার, লিপজেল সাড়ে ৪ হাজার, মরিয়ম ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। চারা বিক্রি হয় ১ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকায়। কাটিং করা কলমের চারা বিক্রি হয় ১৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকায়। এসব চারার গ্যারান্টি থাকে। দেশের যেকোনো মাটিতে সৌদি খেজুর ফলানো সম্ভব।
উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘খেজুরের চারায় রোগবালাই খুব কম। আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিই। তবে কোনো প্রকল্প থেকে সরাসরি সহযোগিতা দিতে পারি না। সরকার প্রকল্প নিলে চাষি উপকৃত হবেন।’
ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার মোখতার আহমেদ বলেন, ‘সম্প্রতি বাগানটি দেখতে গিয়েছিলাম। খেজুর খেয়ে দেখেছি, স্বাদ সৌদির মতোই। সৌদি খেজুর চাষ সম্প্রসারণ ও প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব কেবিনেট মিটিংয়ে তুলব।