দিনাজপুরের কর্ণাই হাজীপাড়ার যুবক ইয়াছিন আলী রাকিব শখের ছয়টি গাপ্পি মাছ দিয়ে শুরু করেছিলেন ছোট্ট অ্যাকোয়ারিয়াম। আজ তা পরিণত হয়েছে দেশের ৬৪ জেলায় মাছ সরবরাহকারী সফল খামারে। রাকিবের খামারে আছে ১৮ প্রজাতির রঙিন মাছ। তার উদ্যোগে স্থানীয় শিক্ষার্থীরাও অনলাইনে মাছ বিক্রি করে পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন। স্ত্রীসহ খামার পরিচালনা করছেন তিনি। স্বপ্ন, সাহস ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে ছোট শখও হতে পারে সাফল্যের গল্প। রাকিব তা প্রমাণ করেছেন।
২০১৯ সালের শেষ দিকে মাত্র ৩০০ টাকায় ছয়টি গাপ্পি মাছ ও ৬০ টাকায় একটি খাবারের প্যাকেট কিনে রাকিব শুরু করেছিলেন শখের মাছ পালন। প্রথমে বাজারজাত করার কোনো চিন্তা ছিল না। কিন্তু মাছগুলো বড় হতে হতে বাচ্চা দিতে শুরু করলে নতুন স্বপ্নের আলো জ্বলে ওঠে। সেই স্বপ্নই আজ রূপ নিয়েছে ‘ইয়াছিন অ্যাকুয়া ফার্ম’ নামের সফল উদ্যোগে।
রাকিব বলেন, ‘শুরুর দিকে শুধু শখের জন্য মাছ রাখি। কিন্তু যখন মাছ বাচ্চা দিতে শুরু করল, তখন মনে হলো, এর মাধ্যমে কিছু করা সম্ভব।’
এক সময় তিনি দুটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। পরে চাকরি ছেড়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিলেন মাছ চাষে। আজ ওই সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে তার জীবন।
বর্তমানে তার খামারে ১৮ প্রজাতির মাছ রয়েছে- গাপ্পি, মলি, প্লাটি, সরটেইল, জেব্রা, কই কার্প, কমেট, গোড়ামী, অ্যাঞ্জেল, টাইগার বার্ব, টেট্রা, ব্ল্যাকমর, রেড কেপ, গোল্ড ফিশ, পেরোট ও এলগি মাছসহ নানা বৈচিত্র্য। বাঁশ ও জালে ঘেরা ছোট ছোট চৌবাচ্চায় সাজানো এসব মাছ এখন তার খামারের পরিচয়।
রঙিন মাছ চাষে রাকিবের খামার থেকে দেশের ৬৪ জেলায় মাছ বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ১৭ থেকে ১৮ প্রজাতির মাছ বাজারে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ থেকে ছয়জন শিক্ষার্থী তার কাছ থেকে মাছ সংগ্রহ করে খুচরা বিক্রি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন।
রাকিব বলেন, ‘আমার খামারে এখন ১৮ প্রজাতির মাছ আছে। দেশের সব জেলায় মাছ যাচ্ছে। মাসে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভ হয়। আগে চাকরি করতাম, কিন্তু এখন নিজের কিছু গড়ে তোলার আনন্দ আলাদা।’ তিনি আরও জানান, তার স্ত্রী সার্বিক সহযোগিতা করছেন। মাছের খাদ্য দেওয়া, পরিচর্যা ও বিক্রির সময়ও তার স্ত্রী সাহায্য করেন। আস্তে আস্তে খামার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আগামীতে আরও কয়েকজনের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
‘ইয়াছিন অ্যাকুয়া ফার্ম’ এখন একটি খামার স্বপ্ন, সাহস ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক। রাকিবের উদাহরণ প্রমাণ করে, সামান্য শখও পরিণত হতে পারে সাফল্যের গল্পে, যদি থাকে অধ্যবসায় ও বিশ্বাস।
দিনাজপুর শহরের বাসিন্দা রুবেল হাসান বলেন, ‘রাকিব ভাইয়ের খামারের মাছের রং আর স্বাস্থ্য দেখে অবাক হয়েছি। মাছগুলো টেকসই ও মানসম্মত। কিনে অ্যাকোয়ারিয়াম সাজাতে দারুণ আনন্দ লাগে।’
হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহিমা আক্তার বলেন, ‘আমি ও আমার বন্ধুরা রাকিব ভাইয়ের খামার থেকে মাছ নিয়ে অনলাইনে বিক্রি করি। এতে পড়াশোনার খরচ চলে। তিনি সব সময় সাহায্য করেন, কোন মাছের চাহিদা বেশি তা শেখান।’
রঙিন মাছপ্রেমী আবুল কাশেম বলেন, ‘আগে এসব মাছ ঢাকাসহ বড় শহর থেকে আনতে হতো, এখন এখানেই পাই। রাকিবের খামারের মাছ সুন্দর, দামও হাতের নাগালে। সত্যিই তিনি দিনাজপুরে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’
সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শারমিন আখতার বলেন, ‘তরুণ উদ্যোক্তা ইয়াছিন আলী রাকিব সত্যিই অনুকরণীয়। বাড়ির আঙিনায় ছোট ছোট হাউসে রঙিন মাছ চাষ করে তিনি সফলতা অর্জন করেছেন। আমরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিই। তার সাফল্য দেখে এখন অনেক তরুণ আগ্রহী হচ্ছেন রঙিন মাছের খামার গড়তে।’