দেশের অর্থনীতি অস্থিতিশীল। ডলার সংকট তীব্রতর। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও দুশ্চিন্তা কাটছে না। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে প্রবাসী আয়। কিন্তু হুন্ডির দাপট দিনে দিনে প্রবাসী আয়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে প্রবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আয়ও বাড়ছে। কিন্তু সে আয় বৈধপথে আসছে না। ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা না আসায় প্রবাসীদের আয় রেমিট্যান্সের হিসাবে যোগ হচ্ছে না। বিষয়টি বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া প্রবাসী আয়ের হিসাব ঠিক নেই। বিশ্লেষকদের মতে, সঠিক হিসাব করার সুযোগও নেই। অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম রেমিট্যান্স ও প্রবাসীবিষয়ক গবেষণায় বলেছেন, ‘দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া হিসাবের চেয়ে দ্বিগুণ বা আরও বেশি হবে।’
গত সেপ্টেম্বরে বৈধপথে আসা প্রবাসী আয়ে রেকর্ড পতন ঘটেছে। এ মাসে দেশে আসা প্রবাসী আয় বিগত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে বৈধপথে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটু বেশি। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ১৬০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় ২১ দশমিক ৫৬ শতাংশ আয় কমে এসেছে। এর পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করা দরকার। কেন কমল প্রবাসী আয়? ২০২১-২২ সালে করোনার কারণে হুন্ডি কার্যক্রম চলতে না পারায় ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছিল। ওই বছর দেশ সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পায়।
‘খবরের কাগজ’-এ প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সৌদি আরবে নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ ও রংমিস্ত্রির ঠিকাদারি কাজ করেন এমন একজন জানিয়েছেন, আকামা অনুযায়ী তিনি মাত্র ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ রিয়েল দেশে পাঠাতে পারেন প্রতি মাসে। কিন্তু তার আয় ৫ হাজার রিয়েল বা আরও বেশি। পুরো আয় ব্যাংক হিসাবে পাঠাতে গেলে সংশ্লিষ্ট প্রবাসীকে ওই দেশের আইন অনুযায়ী জবাবদিহি করতে হয়। আইনি পদক্ষেপও আছে। এসব এড়াতে তিনি টাকা পাঠান হুন্ডিতে। তার মতো অসংখ্য প্রবাসী ঠিকাদারি, ক্ষুদ্র ব্যবসা বা বাড়তি কাজ করে বাড়তি আয় করেন। তাদের টাকাও দেশে আসে হুন্ডির মাধ্যমে। অনেক প্রবাসী মালিকপক্ষের হয়ে লোক নিয়োগের কাজও করেন। তারাও বাড়তি আয় করেন। সে টাকাও তারা দেশে পাঠান হুন্ডিতে। হুন্ডিতে টাকা পাঠালে রেট বেশি পাওয়া যায় বলে তারা জানান।
‘খবরের কাগজ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য মতে, জামালপুর জেলার পাকুল্য দক্ষিণপাড়া গ্রামে ৩০ জন প্রবাসী আছেন। এর মধ্যে দুজন ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠিয়েছেন। বাকিরা টাকা পাঠান হুন্ডিতে। লেনদেন হয় হুন্ডিতে। প্রবাসীরা এসব হুন্ডির অকথিত এজেন্ট। হুন্ডির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালকদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয় নিয়মিত। কেউ দেশে টাকা পাঠাতে চাইলে তার পাশের শ্রমিকই ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। রেটও ভালো। তাতে সরকারের দেওয়া প্রণোদনার চেয়েও বেশি অর্থ মেলে। হুন্ডিচক্রের সবাই প্রভাবশালী।
প্রবাসীদের ব্যাংক হিসাব থাকলেও বিকল্প পথেই তারা প্রতিনিয়ত উৎসাহী হচ্ছেন, এ প্রবণতা রোধ করতে হবে। আবার, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যাদের বেতন হয় তাদের নিজস্ব খরচ বাদে বাকি টাকা ব্যাংকের মাধ্যমেই পাঠান। বাইরের দেশে হিসাবে গরমিল বা ভুল হলে কৈফিয়ত দেওয়াসহ শাস্তি ও জরিমানা দিতে হয়। এ জন্য অনেকেই হুন্ডির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। প্রবাসী আয়-সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ব্যাংকিং খাতে এবং খোলা বাজারে ডলারের লেনদেনের বড় পার্থক্য তৈরি হওয়ার কারণেই আনুষ্ঠানিক ব্যাংক চ্যানেলে প্রবাসী আয় আসা কমে গেছে। যে কারণে হুন্ডির কবলে পড়েছে এ খাতটি।
হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত রেমিট্যান্সের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে দেশে আসে না, যা সরকারি হিসাবে যোগ হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করেন, বর্তমানে যে পদ্ধতিতে ডলারের দাম বাড়তে না দিয়ে স্থানীয় মুদ্রা টাকাকে শক্তিশালী করে রাখা হয়েছে; তাতে প্রবাসী আয় কমে যাচ্ছে। এই নীতি কোনোভাবেই কার্যকর হচ্ছে না। শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টি মানতে চাইছেন না। ফলে রিজার্ভেরও পতন ঠেকানো যাচ্ছে না।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের দাম বাজারভিত্তিক করা হলে প্রবাসী আয় বাড়বে। প্রবাসী আয় আমাদের অপার সম্ভাবনার জায়গা। এটিকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। অর্থনীতির সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে মুখথুবড়ে পড়বে এ খাতটি। এদিকে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ায় প্রবাসী আয় কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘটনাগুলো আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে প্রবাসী আয় বাড়াতে। সাধারণ নাগরিকরা আর অর্থনৈতিক মন্দা ও শঙ্কায় থাকতে চান না। এ ব্যাপারে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।
সালমান/