বঙ্গবন্ধু একটি জাতির রূপকার, একটি জাতির পিতা। আমাদের চারপাশে অনেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বুলি আওড়িয়ে অনেক কিছু বাগিয়ে নিয়েছেন বা নিচ্ছেন বটে, তবে তার আদর্শ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকছেন নিজেদের কর্মকাণ্ডের বেলায়।
জাতীয় জীবনে বিশেষ অবদানের জন্য, সৃজনশীল প্রতিভার জন্য কিংবা গৌরবময় কর্মকাণ্ডকে বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডিগ্রি দিয়ে থাকে। সম্মানসূচক ডিগ্রির মধ্যে আছে- স্নাতোকত্তর, ডক্টর অব লিটারেচার, ডক্টর অব ফিলোসফি, ডক্টর অব ল’জ। ইতালির বোলোনিয়া শহরে অবস্থিত একটি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সম্মানসূচক ডক্টর অব ল’জ ডিগ্রি প্রদান করে। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় লিওনেল উডভিলকে ১৪৭৮/৭৯ সালে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। লিওনেল উডভিল এক্সেটারের ডিন এবং চতুর্থ এডওয়ার্ডের শ্যালক ছিলেন। তার একটি ব্যাচেলর ডিগ্রি ছিল ক্যানন আইনে। এর পর কেমব্রিজ ১৪৯৩ সালে কবি জন স্কেল্টনের জন্য সম্মানসূচক ডিগ্রি দিয়েছিল, যিনি পাঁচ বছর আগে অক্সফোর্ড থেকে একই সম্মান পেয়েছিলেন। সম্মানসূচক ডক্টরেট লাভ করেছেন যারা, তাদের মধ্যে আছেন- মেরিল স্ট্রিপ, মোহাম্মদ আলী, আরেথা ফ্র্যাঙ্কলিন, ডেনজেল ওয়াশিংটন, অপরাহ উইনফ্রে, বেন অ্যাফ্লেক, কেরি ওয়াশিংটন, হিলারি ক্লিনটন প্রমুখ। ভারতের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যাদের সম্মানসূচক ডক্টরেট দিয়েছে তাদের মধ্যে আছেন- দীনেশ চন্দ্র সেন, সত্যেন্দ্র নাথ বোস, সুনীতি কুমার চ্যাটার্জি, হেমন্ত কুমার মুখোপাধ্যায়, অমর্ত্য কুমার সেন, লীলা মজুমদার, মৃণাল সেন, প্রণব মুখার্জি, অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি প্রমুখ। সম্মানসূচক ডিগ্রি দেওয়ার ঐতিহ্য পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করলে ১৯৪০ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ডক্টরেট অব লিটারেচার সম্মানসূচক ডিগ্রি দেওয়ার জন্য শান্তি নিকেতন একটি বিশেষ সমাবর্তন আয়োজন করেছিল। ইন্দোনেশিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি সুকর্নোকে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়, বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়, লোমোনোসভ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৬টি সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করা হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্যের আলবার্টা ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সাম্মানিক ডক্টর অব লিবারেল আর্টস, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি এবং জাপানের ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটি যথাক্রমে সম্মানসূচক ডক্টর অব ল’ উপাধিতে ভূষিত করেছে।
এবার বঙ্গবন্ধুকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ল’জ দেওয়া হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। জানা যায়, এই প্রস্তাবটি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য অধ্যাপক কবি আব্দুস সামাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮তম উপাচার্য অধ্যাপক মো. আক্তারুজ্জামান এবং ২৯তম উপাচার্য অধ্যাপক মাকসুদ কামাল বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে নেওয়ায় সেই স্বপ্ন আজ সত্যি হতে চলেছে। আমি বঙ্গবন্ধুকে তার দুটি গ্রন্থ ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছিলাম ২০১৯ সালের মার্চে। বিভিন্ন কারণে সেটা আজও সম্ভব হয়নি। এমন একটি মহান কাজের জন্য যে আয়োজন প্রয়োজন সেটা করতে সময় লাগে। হয়তো একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধুর সৃজনশীল কাজের জন্য ডিগ্রি দিতে সমর্থ হবে।
দিনটি নিঃসন্দেহে জাতির জীবনে আনন্দের দিন। এই মহৎ কাজটির জন্য কীভাবে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধন্যবাদ দেব তা বুঝতে পারছি না। আনন্দে মানুষ হাসে এবং কাঁদে। আজ বলব না কাঁদো বাঙালি কাঁদো। যেমনটি আমরা বলতাম ও কাঁদতাম ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সাল থেকে। আজ বঙ্গবন্ধু এক উচ্চমাত্রায় বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। অনেকেই অনুতপ্ত তাদের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য। জাতিসংঘ মুজিববর্ষ পালন করেছে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে ইউনেস্কো সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। তবে দুটি রাষ্ট্র এখনো বঙ্গবন্ধুকে সেই মর্যাদা দিতে ব্যর্থ। একটি যুক্তরাষ্ট্র, অপরটি কানাডা। দিবালোকের মতো স্পষ্ট- ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল মানবাধিকারের সর্বোচ্চ লঙ্ঘন। সব জেনেও ওই দুই রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুর খুনিদের নিরাপদে জীবনযাপনের সুযোগ দিয়ে আসছে। যারা সেদিন খুনিদের পাশে ছিল আজ তাদের রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়ার একটি ভ্রান্ত প্রবণতা আমরা দেখতে পাই, যা আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়।
উন্নয়নশীল অন্য দেশগুলোর মতো কমবেশি বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন সব সময় হয়ে থাকে। এখনো হচ্ছে। তবে সেটার পাশাপাশি কিছু উন্নয়ন হয়েছে। যেমন নারীর অধিকার যেভাবে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, যেভাবে শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা অতুলনীয়। দারিদ্র্যবিমোচনের সূচক বিশ্ববাসীকে মোহিত করেছে। যাদের হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে তাদের বিচারের আওতায় আনার সাহস আমাদের অনেকেরই নেই। বঙ্গবন্ধু মানবাধিকারের প্ৰতীক। আজ যে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডিগ্রি দিচ্ছে সেই বিশ্ববিদ্যালয় একদিন তার ছাত্রত্ব কেড়ে নিয়েছিল। নির্মমতার এই ইতিহাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেকদিন বহন করেছে। আওয়ামী লীগ বা বিএনপির বিভাজন আছে বলে আমরা এখনো তাকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে পারিনি। কিন্তু সেদিন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হয়ে নিজের শিক্ষাজীবনকে জলাঞ্জলি দিয়ে বাঙালির অধিকার রক্ষায় রাজনীতির মাঠে থেকেছেন।
বঙ্গবন্ধু একটি জাতির রূপকার, একটি জাতির পিতা। আমাদের চারপাশে অনেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বুলি আওড়িয়ে অনেক কিছু বাগিয়ে নিয়েছেন বা নিচ্ছেন বটে, তবে তার আদর্শ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকছেন নিজেদের কর্মকাণ্ডের বেলায়।
এই চাতুরতার রাজনীতি আমাদের জাতিকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে গেছে। আমরা দেশ গড়ার পরিবর্তে দেশ থেকে অর্থ পাচার করছি। দেশের সম্পদ সস্তায় বিক্রি করে দিচ্ছি , উচ্চমূল্য দিয়ে ঋণের বোঝা জনগণের মাথায় চাপিয়ে দিয়ে উন্নয়ন করে নিজে ধনবান হচ্ছি। এভাবে প্রতারণা যারা করছে, তাদের ঠেকাবার কেউই নেই। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমাদের তরুণ সমাজের মধ্যে হতাশা জন্ম নিচ্ছে।
সারা দেশের মানুষ যেভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ স্বপ্নে উদ্বেলিত হয়েছিল, আজ সেরকমভাবে জাগরণ সৃষ্টি করতে কেউই পারছে না। কারণটা আমাদের সবার জানা। কিন্তু রুখে দাঁড়াবার চেষ্টা কেউই করছেন না। জনগণ বুঝতে পারছে, সরকার পরিবর্তন হলেও তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না বা যে মেধা ও সম্পদ পাচারের ধারা সৃষ্টি হয়েছে সেখান থেকে ফেরার সম্ভাবনা নেই বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
এ সময় বুদ্ধিজীবীদের দিকে তাকিয়ে আছে জনগণ। আজ বঙ্গবন্ধুকে কেবল সম্মানসূচক ডিগ্রি দিয়ে বুদ্ধিজীবীরা দায়সারা কাজটি করছেন, তারা তা বুঝতে পারছেন কি?
বঙ্গবন্ধু সারাজীবন মানবাধিকারের জন্য লড়াই করে জাতিকে মুক্ত করতে চেয়েছেন। আর আমরা বিদেশের কাছে ছুটছি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য। দীর্ঘদিন কংগ্রেস ভারত শাসন করেছে কিন্তু তাদের বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়নি বা সেই দাবির জন্য বিদেশিদের শরণাপন্ন হয়নি। আমরা বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা যদি নিয়ে থাকি তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ কেন ঘুমিয়ে? সেখানে আমাদের সব দলের শিক্ষক আছেন। তারা বসেন, আলোচনা করেন এবং সরকার ও বিরোধীদলকে একই মঞ্চে নিয়ে আসেন এবং একটি সুস্থ সমাজ গঠনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে ভূমিকা রাখেন, যেভাবে আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতার যুদ্ধে অবদান রেখেছেন।
প্রায় একচল্লিশ বছর আগে তারুণ্যের স্বপ্নভুবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। সেদিন হলে একটি সিটের জন্য আমাদের তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। একেবারে কুঁকড়ে আমাদের বাঁচতে হয়েছে সিট সংকটের কারণে। সেদিন নতুন বাংলা মানে এরশাদের ছাত্র সংগঠন জোর করে রাজনীতি করতে বাধ্য করত। আমরা চাই আমাদের সন্তানরা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করবে। সেই রাজনীতির প্রতিবন্ধকতা হলো হলের সিট। আজকের এই শুভক্ষণে মাননীয় প্ৰধানমন্ত্রীর কাছে দাবি- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে বঙ্গবন্ধু মানবাধিকারের কথা বলেছেন, সেভাবে বুক উঁচু করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা ছাত্রদের আবাসন সমস্যা দূর করতে নতুন হল নির্মাণের অর্থ বরাদ্দ দেবেন। আমার দাবি থাকবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের দাবি- এটিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেওয়ার, সেটা পূরণ করবেন। যাতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বা সান্ধ্যকালীন কোর্সে কিংবা উইকেন্ড প্রোগ্রামে ধাবিত না হয়ে বিবেকবান শিক্ষক হয়ে শিক্ষা দেন এবং জাতির কল্যাণে অবদান রাখেন।
আমাদের শিক্ষার্থীরা অপুষ্টিতে ভোগে। ফলে ক্লাসে তারা মনোযোগী হয় না। আমার দাবি থাকবে, যেন শিক্ষার্থীদের সবাইকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। যাতে তারা অপুষ্টিতে না ভোগে। মানবসম্পদের উন্নয়ন হোক আপনার আগামী দিনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। আর তাতে জেগে উঠবে তরুণ সমাজ, বাস্তবায়িত হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা।
মা যদি রুগ্ন হয়, তার সন্তান রোগী হয়ে জন্ম নেয়। আর সেই রুগ্ন শিশুকে দিয়ে যেমন সুন্দর স্বপ্ন দেখা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ও মায়ের মতো। রুগ্ন বিশ্ববিদ্যালয় জাতি গঠনে সফল হয় না। আজকের রাজনীতি হোক মানবসম্পদের উন্নয়নের রাজনীতি, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে তরুণ সমাজ। জাতির পিতার রক্তের ঋণ পরিশোধে তারুণ্যের স্বপ্নভুবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আয়োজন সফল হোক।
লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়