আলুর দাম বৃদ্ধি মধ্যবিত্তদের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। একদিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস, অন্যদিকে আলুর মতো সাধারণ সবজি কিনতে ভোক্তার পেরেশানি অবস্থা। বাংলাদেশের আবহাওয়া আলু উৎপাদনে সবসময়ই অনুকূল। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ও উন্নত জাত প্রবর্তনের কারণে উৎপাদনও বেড়েছে। তাই দাম বৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে আলুর দাম সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।
কাঁচাবাজারে বর্তমানে আলুর কেজি ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, যা দেশের বাজারে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ দাম। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সাধারণ মানুষ আলুর মতো সবজি কিনতেও হিমশিম খাচ্ছে। অথচ এবার দেশে রেকর্ড পরিমাণ আলু উৎপাদিত হয়েছে বলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে বলা হচ্ছে। তারপরও আলুর মূল্য চড়া কেন?
দেশে আলুর উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে- এমন দাবি করে গত মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়েছে, যৌক্তিক কারণ ছাড়াই একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে আলু বিক্রি করছে। বাজারে দাম স্বাভাবিক রাখা ও আলুর সরবরাহ বাড়াতে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হিমাগার ব্যবসায়ীরা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘মধ্যস্বত্বভোগীরা আলু কিনে মজুত রেখেছেন। সংকট তৈরি করে চাহিদার তুলনায় কম করে বাজারে ছাড়ছেন। তাহলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর কেন আলুর দর নিয়ন্ত্রণে কোনো সফলতা দেখাতে পারছে না।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান বলছে, আগের বছরের তুলনায় এ বছর দেশে আলুর উৎপাদন ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি হয়েছে। এর পরিমাণ ১ কোটি ৪ লাখ টন। এদিকে সরকার যা বলছে তার সঙ্গে একমত হতে পারেনি বাংলাদেশ হিমাগার মালিক সমিতি।
জানা যায়, সেপ্টেম্বরে আলু চাষের পর তা সংগ্রহ করতে ৯০ দিন সময় লাগে। জানুয়ারিতে ফসল তোলার পর পরবর্তী কয়েক মাস বাজারে আলুর পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে। অনেক ব্যবসায়ী শীতে বিক্রির জন্য হিমাগারে আলু মজুত করে রাখেন। অনেক সময় আড়তদাররাও হিমাগার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আলু কিনে নিজেদের কাছে রাখেন। পরে বাড়তি মুনাফা করতে সুবিধামতো সময়ে আলু বাজারে ছাড়েন।
গত মঙ্গলবার নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘কোল্ড স্টোরেজ (হিমাগার) মালিকরা একটি সিন্ডিকেট করে আলুর দাম বাড়াচ্ছেন।’
গত ১৪ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে আলুসহ তিন পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। কোল্প স্টোরেজ পর্যায়ে ২৬-২৭ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে ৩৫-৩৬ টাকা মূল্যে আলু বিক্রির জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। এবং এই নির্দেশনা বাজারে মানা হচ্ছে কি না, তা মনিটরিংয়ের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসনসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নির্দেশনা মানা হয়নি। যার চিত্র বর্তমান আলুর দর দেখলেই প্রতিয়মান হয়।
বাংলাদেশ হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী ‘খবরের কাগজ’কে জানান, হিমাগারের ধারণক্ষমতায় প্রায় ২০ শতাংশ এবারও খালি পড়ে আছে। এবারে যদি আলুর উৎপাদন বেশি হয়, তাহলে এই বাড়তি আলু কোথায় গেল, এমন প্রশ্ন করেন ব্যবসায়ী এই নেতা। তিনি জানান, কোনো হিমাগারে বাড়তি আলু মজুত করে রাখা নেই। স্বাভাবিকভাবে প্রতি বছর যা রাখা হয়, এবারে তার ব্যতিক্রম হয়নি। মধ্যস্বত্বভোগীরা আলু কিনে মজুত করে রেখেছেন কি না, তা সরকারের নজরদারি করতে হবে।
আলুর অস্থিতিশীল বাজার স্থিতিশীল করতে হলে সরকারিভাবে আলু সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। আড়তদার ও বড় ব্যবসায়ীদের হাতে বর্তমান আলুর বাজার। এখানেই সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজি সোচ্চার। মধ্যস্বত্বভোগীরা আলুর দাম বৃদ্ধিতে বেশি লাভবান হচ্ছেন। তাই প্রথমেই সিন্ডিকেট চক্রকে শনাক্ত করে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বড় বড় বাজারে কৃষকদের সরাসরি পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা রাখতে হবে। কোল্ড স্টোরেজে সরকার নির্ধারিত দামে খুচরা বিক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। আলুর দাম কমাতে বাজারে সরকারের কঠোর নজরদারির কোনো বিকল্প নেই।