স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন আজ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। জীবনযাত্রার খরচের চাকা ক্রমাগত ঘুরলেও বাড়েনি আয়। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ভোক্তার জন্য বাজার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আলু, ডিম, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের দুই বেলা আহার করাটাও দুরূহ হয়ে উঠেছে। বাজারভেদে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। নিত্যপণ্যের বাজারে যে সিন্ডিকেট কাজ করছে, এটা খোদ সরকারের ভেতরেই আলোচনা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আলুর দাম বাড়ার নেপথ্যে সিন্ডিকেট দায়ী। সরকার এদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।’ বাণিজ্যমন্ত্রী বেশ কিছুদিন আগে বলেছিলেন, ‘বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে গেলে পণ্যের সংকট দেখা দেবে।’ পরে তিনি বলেছেন, আইন করে পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এখন প্রশ্ন হলো, নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার তদারকি তাহলে কে, কীভাবে করবে?
করোনা মহামারির রেশ কাটতে না কাটতেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বিশ্বের অর্থনীতিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির বৈরী হাওয়া বিরাজ করছে। এই মূল্যস্ফীতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতিমুনাফার লোভে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
এদিকে নির্বাচনী ট্রেনে চড়েছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রার্থীরা জনসমর্থন আদায়ে যখনই জনগণের দোরগোড়ায় যাচ্ছেন, তখনই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি। সাধারণ জনগণের প্রশ্ন, জিনিসপত্রের এত দাম কেন? প্রতিবেশী দেশ ভারতে দ্রব্যমূল্য বা রেলভাড়া বাড়লে মন্ত্রীকে জবাবদিহি করতে হয়। অনেক সময় পদত্যাগ করার উদাহরণও আছে। অথচ বাংলাদেশে পণ্যের দাম লাগামহীন বাড়লেও মন্ত্রীদের টনক নড়ে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতির যে হার দাঁড়িয়েছে, তা গত কয়েক বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ। বিশেষ করে ‘খাদ্য মূল্যস্ফীতি’ বিপজ্জনকভাবে বেড়ে ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন স্বল্প ও নিম্ন আয়ের মানুষ। কারণ তাদের আয় বাড়েনি, বেড়েছে ব্যয়। লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ বাজারের তালিকা কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছেন। নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কাজী ফার্মসহ দেশের নামীদামি তিন-চারটি গ্রুপ ডিমের বাজার দখল করে আছে। ডিমের ডজন এখনো ১৫০ টাকা। অথচ ডিম আমদানির অনুমতি দিয়ে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। তাতেও ভোক্তা ন্যায্য দামে কিনতে পারছেন না।
গবেষণা সংস্থা পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘কিছু পণ্য আছে যেমন- চাল, আটা, তেল, চিনি এগুলোর বাজার শক্তভাবে তদারকি করতে হবে। কারণ এখানে সিন্ডিকেট রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির দুর্বলতার কারণেই সবকিছুতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অর্থনীতি স্থিতিশীল হলে অন্য সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, অ্যাসেনশিয়াল কমোডিটি অ্যাক্ট-১৯৫৬ অনুযায়ী, কেউ পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা মজুত করার বিষয়টি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই আইনের প্রয়োগ দেখা যায়নি। প্রতিযোগিতা কমিশনের আইনেও পণ্য মজুত কিংবা কারসাজির বিষয়ে শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু তা কার্যকর নয়।
দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। বাজারে পণ্যের নির্ধারিত দামের বিষয়টি তদারকি করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। এ ছাড়া কৃষি অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরও বাজার নিয়ন্ত্রণে নজরদারি করে থাকে। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা যায়। ফলে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকার পরও তা মানা হচ্ছে না। সরকারি সংস্থাগুলোও কার্যকর টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে না। যদিও সংস্থা বলছে, অসাধু পন্থায় যারা পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন, ওদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে। মজুতদারি সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে যেন বাজার কোনোভাবেই প্রভাবিত হতে না পারে, তার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতের সংখ্যা এবং পরিধি বাড়াতে হবে। খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি বাড়াতে হবে। টিসিবিকে ব্যবহার করে সরকার বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। পণ্যভেদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে একটি সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে নিত্যপণ্যের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।