ডলারসংকট এতটাই তীব্র হয়েছে যে, আমদানি-বাণিজ্য অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। এদিকে সাধারণ মানুষ ডলার না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। ডলারের সরবরাহের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সীমা মানছে না কোনো কোনো ব্যাংক। আমদানি ঋণপত্রের (লেটার অব ক্রেডিট) ব্যবসা ধরে রাখতে ব্যাংকগুলো যে যেভাবে পারছে ডলার কিনছে। একই ভাবে ডলারের বর্ধিত ক্রয়মূল্যের মুনাফা ধরে আমদানিকারকের কাছ থেকে দামও বেশি আদায় করা হচ্ছে।
আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যস্ফীতি এখন চরমে। গত একযুগের মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ, অর্থাৎ ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ ছুঁয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারসংকটে ব্যাংকগুলোকে সহায়তা দিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঘটিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদরা সংকট উত্তরণে হুন্ডি ও অন্যান্য উপায়ে অর্থ পাচার রোধ, অবৈধ ব্যাংক ঋণ বন্ধ, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন। এ সংকট মোকাবিলায় ডলারের বিনিময় মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি বাজারভিত্তিক চাহিদা ও জোগানের ওপর ছেড়ে দিতেও পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এর প্রয়োগ কতটা কার্যকর করতে পারছে সেটাই দেখার বিষয়।
খোলাবাজারে ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা দরে, কোথাও ১২৭ টাকা বা আরও বেশি। ব্যাংক ও খোলাবাজারে বিনিময় হারের ব্যবধান কয়েক মাস কম থাকার পর তা আবার বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডলারের মজুত কম থাকা এবং বেপরোয়াভাবে হুন্ডির দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে।
ডলারসংকটকালে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে আর ডলার বিক্রি না করার ঘোষণা দিয়েছে। এমনিতেই কয়েক মাস ধরে আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা চালু রাখা হয়। তার পরও ডলারের সরবরাহ ও বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এদিকে সংকটে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকের বিরুদ্ধে ডলারের বিলগুলো পরিশোধ না করার অভিযোগও প্রতি মাসে বাড়ছে। খবরের কাগজ প্রতিবেদকের কাছে এমন দুটি অভিযোগের তথ্য এসেছে। সূত্র বলছে, গত পাঁচ মাসে বিভিন্ন ব্যাংকের বিরুদ্ধে ডলারের বিলগুলো পরিশোধ না করার শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এবং বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) চলমান ডলারসংকটে দুই মাসে চারবার রেট পরিবর্তন করে। আমদানিতে ডলারপ্রতি দাম নির্ধারণ করে দেয় ১১১ টাকা। আর রেমিট্যান্সে প্রণোদনাসহ ডলারপ্রতি ১১৬ টাকা। কিন্তু এসব নির্দেশনা মানেনি ব্যাংকগুলো। আমদানি ঋণপত্রের ডলারপ্রতি দাম নেওয়া হয় ১২৪ টাকা পর্যন্ত। আর ১১৬ টাকার বেশি দরে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করার অভিযোগও রয়েছে।
সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংক এবিবি ও বাফেদা নেতাদের ডেকে গত বৃহস্পতিবার আমদানিতে ডলারপ্রতি রেট ১১১ টাকার বেশি না নিতে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্দেশনা জারি করে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এবিবি ও বাফেদা পরস্পরের সহযোগিতা চেয়েছে।
ব্যাংকগুলোর ডলার সংগ্রহে এমন মরিয়া হয়ে ওঠার প্রবণতা কেন তৈরি হলো? ডলারের প্রকৃত চাহিদা কোথায়, কেন ডলার নিয়ে কাড়াকাড়ি, ডলারের সংকট ঠিক কতটা গুরুতর? এসব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও শীর্ষ ব্যাংকাররা খবরের কাগজকে বলেন, ‘পণ্য ও সেবায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ, বিদেশে চিকিৎসা ও উচ্চশিক্ষা এবং বিদেশ ভ্রমণে ডলারের প্রয়োজন। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার পেছনে দুর্বল সরবরাহ (সাপ্লাই) দায়ী। তবে পরিস্থিতির চরম অবনতির জন্য রেগুলেটর হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যর্থতাও রয়েছে।’
ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) পরিচালক ড. সাজ্জাদ জহির খবরের কাগজকে বলেন, ‘ডলার মার্কেট অন্য প্লেয়াররা অপারেট করছে। তিনি ইঙ্গিত করেন, রেগুলেটর হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতির ব্যর্থতা রয়েছে। ফলে স্পেকুলেটিভ আচরণ করে ডলারের সরবরাহ ও দর নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। একপর্যায়ে এবিবি ও বাফেদা এখানে হস্তক্ষেপ করে। এ কারণে একেক সময় একেক রেট (ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার) আসে এবং ডলারের বাজারদর অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।’
অনেক ব্যাংকার মনে করছেন, বাফেদা ও এবিবির ঘন ঘন সিদ্ধান্ত বদলানোর ফলে বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। ভুল বার্তা বাজারে যাতে না ছড়ায় সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। ডলারের নৈরাজ্য থামাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর নজরদারি করতে হবে।