দেশের প্রায় ৬০ লাখ মানুষ পোলট্রিশিল্পের সঙ্গে সরাসরি ও আংশিকভাবে জড়িত। দেশের প্রায় ১৭ কোটি জনগণের প্রতিদিনের পুষ্টির চাহিদা পূরণে এ শিল্প ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে।
দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে অত্যাবশ্যকীয় প্রাণিসম্পদ, পোলট্রি ও মাছের খাদ্য বা ফিড উৎপাদকদের দুর্দিন চলছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারের দফায় দফায় পতনকে এ শিল্পসংশ্লিষ্টরা ‘ডাবল ব্লো বা দ্বৈত আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া কাঁচামাল আমদানিতে ঋণপত্র খুলতে ডলার সরবরাহে সংকট তো আছেই। ঋণপত্রের বিপরীতে পণ্য আসার পর বিল পরিশোধে ঋণপত্র খোলার দিনের বিনিময় হারের পরিবর্তে বিল নিষ্পত্তির দিনের এক্সচেঞ্জ রেট আদায় করার কারণেও ব্যয় বেশি হচ্ছে ফিড উৎপাদকদের।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী দেশে গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগল মিলিয়ে মোট গৃহপালিত পশুর সংখ্যা ৫ কোটি ৭১ লাখ ৪৩ হাজার। হাঁস-মুরগির সংখ্যা ৩৮ কোটি ৫৭ লাখ। এ শিল্প থেকে বছরে দুধ আসে ১ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন, মাংস ৮৭ লাখ মেট্রিক টন ও ডিম ২ হাজার ৩৩৭ কোটি পিস। দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনে এ শিল্পের অবদান ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
ফিড উৎপাদনের দরকারি কাঁচামালের প্রায় ৯০ শতাংশ দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। মূল দুটি কাঁচামাল হলো ভুট্টা ও সয়ামিল। আন্তর্জাতিক বাজারে এ দুটি উপাদানের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এ ছাড়া আমদানি কাঁচামাল পরিবহনে জাহাজ ভাড়াও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে ফিডের দাম বাড়াতে এ খাতের সাত সংগঠন একীভূত হয়ে এগোচ্ছে। তারা এ ব্যাপারে সরকারের প্রাণিসম্পদ বিভাগ, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করবে বলে জানিয়েছেন। দেশে মোট ফিড মিলের সংখ্যা চার শতাধিক। এর মধ্যে নিবন্ধিত ২৯০টি। এসব ফিড মিলে বছরে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ মেট্রিক টন পোলট্রি, ডেইরি ও মাছের ফিড উৎপাদন হয়।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রো ফিড ইনগ্রিডিয়েন্টস ইম্পোটার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও খুচরা বিক্রিতে ফিডের দাম বাড়াতে পারছেন না উৎপাদকরা। এমনিতেই ছোট-বড় সব খামারি ফিডের ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এরপর ফিডের দাম বাড়ানো হলে অনেক ছোট খামারি হারিয়ে যাবেন।
ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে গত এক মাসেই এ শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। কাঁচামাল আমদানিতে ঋণপত্র খুলতে গেলে ডলার পাওয়া যায় না। আবার বিল নিষ্পত্তিতে বেশি দাম পরিশোধ করতে হচ্ছে। তথ্য বলছে, গত মে মাসের তুলনায় নভেম্বরে ডলারের বিনিময় হারের কারণে কাঁচামাল আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। একই সময়ে প্রধান কাঁচামাল ভুট্টার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ এবং সয়ামিলের দাম বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ।
ফিড তৈরিতে বিকল্প কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত পণ্যের ক্যাটাগরিতে বিবেচনা করা হলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপ কমবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক একটি সাপ্লিমেন্টারি এসআরও জারি করা হলে ফিড তৈরিতে উৎপাদন ব্যয় কমবে কেজিপ্রতি ৪ থেকে ৫ টাকা। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। খাতসংশ্লিষ্ট কাঁচামালের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে, যাতে ছোট ছোট উদ্যোক্তা বা খামারি হারিয়ে না যায়।