দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ৭ জানুয়ারি। নির্বাচনে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের আয়-ব্যয় ও সম্পদের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছেন। প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগের নির্বাচনের তুলনায় অধিকাংশ মন্ত্রী, এমপির সম্পদ ও নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। কেউ কেউ লাখোপতি থেকে এক লাফে হয়েছেন কোটিপতি। কারও নিজের চেয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের সম্পদ বেড়েছে। মন্ত্রী-এমপিদের অনেকের ক্ষেত্রে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বৃদ্ধির হার অস্বাভাবিক। প্রার্থীর হলফনামায় দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, হলফনামায় সম্পদের যে মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে, তার সঙ্গে প্রকৃত মূল্যের বিস্তর ফারাক।
হলফনামায় সম্পদ অর্জনকালীন মূল্য দিতে বলায় বর্তমান মূল্যের তফাত সহজেই অনুমেয়। খবরের কাগজের তথ্যমতে, বর্তমান সরকারের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মন্ত্রীর হলফনামা দেখে এ তথ্য পাওয়া যায়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশীদ আলম খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের নিয়মে সম্পদের হিসাব দাখিল করলেও সম্পদের মূল্য কম দেখানো আইনসম্মত নয়। এসব বিষয়ে যদি দুদকে অভিযোগ ও প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত আসে, তাহলে দুদক আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে। কারণ এটি দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের মধ্যে পড়ে। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্টদের আয়কর রিটার্নের সঙ্গে হলফনামায় তথ্যের কোনো গরমিল আছে কি না, সেটা খতিয়ে দেখতে পারে।’
কয়েকজন মন্ত্রী-এমপির সম্পদের স্ফীতি দেখলে জনগণের হতবাক হতে হয়। অস্বাভাবিক অবৈধ সম্পদ অর্জনই প্রমাণ করে রাজনীতি একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। অথচ একটা সময় রাজনীতিবিদদের সততার বিষয়টি ছিল প্রশ্নাতীত। তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জন দূরের কথা, ‘নিজের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানোর’ কাজটা তারাই করতেন। আজ আর এগুলো পরিলক্ষিত হয় না। এ জন্য ব্যবসায়ীদের রাজনীতিবিদ হওয়ার বাসনা দিনে দিনে বাড়ছে।
একজন রাজনীতিবিদ জনদরদি হবেন। দেশসেবা করবেন। দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করবেন না। জনপ্রতিনিধি হয়ে জনসেবা করবেন, এটাই প্রত্যাশা। অথচ পত্রপত্রিকা খুললেই দেখা যায়, অধিকাংশ মন্ত্রী-এমপি হলফনামায় সম্পত্তির যে হিসাব দিয়েছেন, বাস্তবে তার চেয়ে তাদের সম্পদের পরিমাণ বহুগুণ বেশি। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, কোনো কোনো মন্ত্রী-এমপির আয় ১০ গুণ থেকে বেড়ে শতকেরও কাছাকাছি। কেউবা এ সংখ্যা ডিঙিয়ে ওপর সারিতে অবস্থান করছেন।
এ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় প্রার্থীরা আয়-ব্যয়ের বা সম্পদের বিবরণী নির্বাচন কমিশনে জমা দেন। যা জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। অনেক প্রার্থী বা তার পরিবারের অর্জিত সম্পদ পূর্ববর্তী নির্বাচনে জমা দেওয়া সম্পদের হিসাবের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। যা আইন ও বিধিসম্মত কি না, তা খতিয়ে দেখা অপরিহার্য।’
মন্ত্রীরা জনকল্যাণে আইন প্রণয়ন করবেন, দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবেন। এ ধরনের অবৈধ সম্পদ অর্জন একজন দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদের কাজ হতে পারে না। নির্বাচনী হলফনামার তথ্যের মাধ্যমে প্রার্থীদের অর্থসম্পদের স্বচ্ছতা, সততা নিরূপণ করা যাবে; এ তথ্য জেনে-বুঝে প্রার্থী বাছাইয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে ভোটারদের- এমনটাই ভাবছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। তবে এবার নির্বাচনী হলফনামায় দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের যে গরমিল, তা নিয়ে উশ্ন উঠেছে। বিষয়টিকে দেখা হচ্ছে নীতিনৈতিকতা ও সততার গলদ হিসেবে। ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পদের তথ্য বা প্রকৃত মূল্য কেউ যদি আড়াল করেন তা অবশ্যই অনৈতিক কাজ বলে বিবেচিত হবে। এটা জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে আশা করা যায় না। অসত্য তথ্য দিলে প্রার্থীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সম্পদের উৎস সম্পর্কে নিরপেক্ষভাবে নিশ্চিত হওয়া এবং আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটে থাকলে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের নিয়মে প্রার্থীরা সম্পদের হিসাব দিলেও এগুলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে খতিয়ে দেখতে হবে।