অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর- টানা তিন মাস ধারাবাহিকভাবে দেশের রপ্তানি আয় কমেছে। রিজার্ভসংকট কাটিয়ে উঠতে রপ্তানি আয় বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হলেও অস্বাভাবিক হারে এ খাতের পতন ঘটেছে। ডিসেম্বরে কমেছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ শতাংশের কম বা ৬ কোটি ডলার। এর মধ্য দিয়ে নতুন বছরে, অর্থাৎ ২০২৪ সালে রপ্তানি খাতে দুঃসংবাদই এল।
চলতি (২০২৩-২৪) অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বরেও কমেছে রপ্তানি আয়। আলোচ্য অর্থবছরের ছয় মাসে- জুলাই-ডিসেম্বরে রপ্তানির লক্ষ্য ছিল ৩ হাজার ১১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। বিপরীতে আয় হয়েছে ২ হাজার ৭৫৪ কোটি ডলার। তবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সামান্য, দশমিক ৮৪ শতাংশ।
গত বছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছিল ২ হাজার ৭৩১ কোটি ১২ লাখ ডলার। ছয় মাসে প্রবৃদ্ধি সামান্য হলেও গত ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধি কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অর্জন কম হয়েছে ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশের ৮৪-৮৫ শতাংশ রপ্তানি আয় তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। এ খাতে আয় কম হওয়ার কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের দেশগুলোর আমদানির চাহিদা সংকোচন। মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক সংকটের কারণে এসব দেশে পোশাকের চাহিদা কমে গেছে। এক কথায় রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কমে গেছে অর্ডারের সংখ্যা। সাম্প্রতিক সময়ে খুবই খারাপ অবস্থা বিরাজ করছে নিট ও ওভেনে। অনেক অর্ডার বাতিল হচ্ছে। তাই ইপিবি প্রবৃদ্ধির যে তথ্য প্রকাশ করেছে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ ইপিজেডের রপ্তানি ডাবল দেখানোর ফলে আয় বেশি দেখাচ্ছে। পোশাক খাত ছাড়াও অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের আয়ের প্রবৃদ্ধিও কমেছে।
বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে রপ্তানি আয় কমে গেছে। এ ছাড়া চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকট, চট্টগ্রাম বন্দরের অদক্ষতা ইত্যাদি কারণে রপ্তানি কম হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তৈরি পোশাক খাতে। পরিস্থিতি উত্তরণ হতে সময় লাগবে।
গত ছয় মাসে এই খাতে ব্যাপকভাবে রপ্তানি আয় কমে গেছে। ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ৫ হাজার ২২৭ কোটি ২০ লাখ ডলারের মধ্যে গত ৬ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৩৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এর মধ্যে অর্জন হয়েছে ২ হাজার ৩৩৯ কোটি ১৩ লাখ ডলার। কমেছে ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। তবে এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৭২ শতাংশের বেশি। কারণ ওই সময়ে রপ্তানি আয় দেশে এসেছে ২ হাজার ২৯৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার।
বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব এবং দেশের রাজনৈতিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানি খাতে। এই খাতকে সচল ও সক্রিয় রাখতে কাস্টমস, বন্ড, ভ্যাট- এগুলোতে সেবার মান বাড়াতে হবে, যাতে কেউ হয়রানির শিকার না হন। রপ্তানিতে নতুন বাজার ধরার ক্ষেত্রে সরকারকে প্রণোদনা বাড়াতে হবে। বাজারব্যবস্থাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়ানোর জন্য রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয়ে সরকারকে আরও অধিক মনোযোগ দিতে হবে। যদিও রেমিট্যান্স আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হন্ডি। ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর প্রবণতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা কমে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রবাসীদের সচেতনতা ও তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারলে রপ্তানি আয় বাড়বে বলে আশা করা যায়।