দেশে দ্রব্যমূল্য যেভাবে বাড়ছে তাতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার সঙ্গে তাল মেলাতে বেসামাল সাধারণ মানুষ। দেশের ব্যবসায়ীদের অতিলোভ প্রবণতা দিন দিন স্ফীত হচ্ছে। মানুষ দুবেলা দুমুঠো খেতে পেল কি না, তা ভাবার সময় তাদের নেই। রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি বাজার থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মোকামেও ধান, চাল, আলু, পেঁয়াজ, ডাল, ছোলা পর্যাপ্ত রয়েছে। মিলগুলোতেও তেল এবং চিনির কোনো ঘাটতি নেই। তারপরও নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। কিন্তু কেউ এর দায়ভার নিচ্ছে না। চলছে পারস্পরিক দোষারোপ।
খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পাইকার ও আড়তদাররা দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। অপরদিকে পাইকার ও আড়তদাররা দুষছেন খুচরা ব্যবসায়ীদের। কেউ বলছেন, শীতের কারণে উৎপাদন কমে গেছে। আমদানিকারকরা বলছেন, এখনো ডলারসংকট বিদ্যমান। সহজে খোলা যাচ্ছে না এলসি। খবরের কাগজের তথ্যমতে, রাজধানীর কৃষি মার্কেটে দুই শতাধিক আড়ত চালের বস্তায় ঠাসা। এসব আড়তে চালের সরবরাহ বেড়ে গেছে। তারপরও দাম চড়া। বিক্রেতারা বলছেন, মিল থেকে বাড়ানো হচ্ছে দাম। তাই খুচরা বাজারে দাম কমছে না। অনেক ব্যবসায়ী একই সুরে কথা বলছেন।
গত সোমবার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন চালের ভরা মৌসুম। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই চালের মানভেদে দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ থেকে ৮ টাকা। একই চিত্র আটা ও ময়দার বাজারেও। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে সবজির দাম বাড়ে ৬ দফায়। কৃষক ৩০ টাকায় সবজি বিক্রি করলেও তা বিভিন্ন হাত ঘুরে রাজধানীর খুচরা বাজারে ১০০ টাকা কেজিতে পৌঁছায়। এ ছাড়া অনেক সময় দাম বাড়ানোর জন্য কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। এভাবে অনেক ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এসব অসাধু ব্যবসায়ীকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পর্যাপ্ত পণ্য থাকার পরও যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন, তাদের বাগে আনতে না পারলে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মূল্যস্ফীতি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক সময় দ্রব্যের দাম বাড়তে থাকে। মূল্যস্ফীতি কেন হচ্ছে তা আগে নির্ণয় করতে হবে। আমরা যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তবে দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। পণ্য পরিবহনে অনেক সময় চাঁদা দিতে হয়। এসব চাঁদাবাজের কারণে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পায়। এটা পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এ জন্য রাস্তায় সব ধরনের চাঁদা বন্ধ করতে হবে। আমরা যদি চাঁদা বন্ধ করতে পারি, তবে পণ্যের দাম অনেকাংশে কমে আসবে। ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশে আমদানি করা পণ্যের দাম অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এতে অতিরিক্ত দামে অনেক পণ্য কিনতে হচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে একধরনের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। দেশে খাদ্যের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা। উৎপাদক স্তর থেকে ভোক্তাস্তর- সব জায়গায় মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছেন। তারা বাজারকে অস্থির করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা বাজারটা একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন। মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করার কারণে মূল্যটা বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতার সঙ্গে হচ্ছে না।’
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হলে দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। সে জন্য পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান যেমন- ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তদারকি জোরালো বা শক্তিশালী করতে হবে। বাজারব্যবস্থাকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। এসব বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে থাকলে নিত্যপণ্যের দাম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।