দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি নৃশংস হত্যা ও বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, বর্তমান সময়ে সামাজিক অপরাধ প্রবণতা মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেরানীগঞ্জের আব্বাবাহিনীর হাতে নৃশংস নির্যাতনের দৃশ্য ভেসে বেড়াচ্ছে ঘটনার পর থেকেই। একইভাবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এক নিরাপত্তাকর্মী আরেক নিরাপত্তাকর্মীকে রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এ নৃশংসতা যারা দেখেছেন তারা সবাই শিউরে উঠছেন। শুধু এই দুটি ঘটনাই নয়, রাজধানীর হাজারীবাগে তানিয়া হত্যা, তুরাগে কলেজবাসের মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনা ছাড়াও নানা অপরাধ ছড়িয়ে পড়েছে দেশে। মানুষ অনেকটাই অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। হিংসা, প্রবৃত্তি, লোভ-লালসার বশবর্তী হয়ে মানুষ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ছোট-বড় সব বিরোধেই পৈশাচিকতা চোখে পড়ছে।
মানুষ অপরাধ করার পর বুঝতে পারে সে অপরাধ করেছে। অপরাধী যদি বুঝতে পারত সে অপরাধ করছে তাহলে খুন, হত্যা, ধর্ষণসহ নানা ধরনের ঘটনা ঘটত না। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোপুরি সচল হওয়ার থাকার পরও দেশে খুন, ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন, প্রতারণা, চাঁদাবাজি, লুটপাট, অর্থ আত্মসাৎসহ নানা ধরনের অপতৎপরতা বেড়েছে দিগুণ গতিতে। ঢাকা শহরে লাখ লাখ মানুষের বসবাস। এর মধ্যে সামাজিক অপরাধ প্রতিনিয়ত ঘটছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ অপরাধ প্রবণতা মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছে। পাবনায় প্রবাসীর স্ত্রী-সন্তানের মরদেহ উদ্ধার, বরগুনায় মেয়েকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় মা-বাবাকে হাতুড়িপেটা, মাদারীপুরে জমি নিয়ে বিরোধে পরিবারের ছয়জনকে কুপিয়ে জখম- এমনই সব নৃশংস বর্বরতার সংবাদ পত্রপত্রিকায় এসেছে।
খবরের কাগজে প্রকাশিত তথ্য মতে, এক বছরে ৫১৩ শিক্ষার্থীর আত্মহনন। এর বড় কারণ অভিমান-প্রেমঘটিত সমস্যা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা ঢাকা বিভাগে। কুষ্টিয়ায় বাবা-ছেলের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার। কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি বলছেন, প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা মনে হলেও হত্যাকাণ্ড হতে পারে। রেজাউল ধর্মান্তরিত হওয়ার পর তার জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনী নিয়ে বেশ জটিলতায় ভুগছিলেন। যার জন্য তিনি তার ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাতে পারেননি। এনিয়ে তিনি বেশ হতাশ ছিলেন। এদিকে খুলনায় দুই সন্তানসহ মায়ের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। কেন এ ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে তা ভাববার বিষয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার ইনামুল হক সাগর খবরের কাগজকে বলেন, ‘পুলিশ নানা ধরনের অপরাধ দমন করতে তৎপর রয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে সামাজিক অপরাধ একটু বেশি হচ্ছে। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে শুধু পুলিশ নয়, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। চোখের সামনে কোনো অপরাধ দেখলে সেটা সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশকে জানাতে হবে। তাহলেই এসব অপরাধ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে সরকার প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখ-কান খোলা রেখে অপরাধ দমনে কাজ করতে হবে। সেটা না হলে সামাজিক মূল্যবোধ হ্রাস, নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক বন্ধন ঢিলে হয়ে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বিচারহীন সংস্কৃতির কারণে এ সংকট ক্রমাগত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।’
ইদানীং দেশে সামাজিক অপরাধের প্রবণতা আশঙ্কজনক হারে বেড়েছে। এ অবস্থা প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এ নিয়ে অনেক উৎকণ্ঠায় রয়েছে সচেতন নাগরিকরা। সামজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামতও ব্যক্ত করেছেন। নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক ও মানবিক মূল্যবোধের অভাবে পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ ভেঙে পড়েছে। সহনশীলতায় যে মাত্রা থাকা উচিত তাও অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। সমাজে সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। মূলত সমাজের ভেতরে আইনের প্রতিপালন করতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধই সমাজের আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী রূপ দিতে পারে। আমাদের সেদিকেই মনোযোগ দিতে হবে।