‘পড়ো বই গড়ো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’- এবারের মূল প্রতিপাদ্য সামনে নিয়ে বাংলা একাডেমির আয়োজনে ঢাকায় শুরু হচ্ছে মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলা ২০২৪। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় সাড়ে ১১ লাখ বর্গফুট আয়তনের মাঠে আয়োজিত এ মেলায় ৬৩৫টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। একাডেমি প্রাঙ্গণে ১২০টি প্রতিষ্ঠান, ১৭৩টি ইউনিট এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৫১৫টি প্রতিষ্ঠান ও ৭৬৪টি ইউনিট বরাদ্দ পেয়েছে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩৬টি প্যাভিলিয়ন থাকবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বেলা ৩টায় বইমেলা উদ্বোধন করবেন। বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘কালেক্টেড ওয়ার্কস অব শেখ মুজিবুর রহমান: ভলিউম-২’সহ কয়েকটি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করবেন। তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এবারের বইমেলা একটু ভিন্ন আঙ্গিকেই সাজানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে পথে বইমেলা পরিদর্শন করবেন, তার দুই পাশে মহান ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও তাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নানা ঘটনাবলি ফুটিয়ে তোলা হবে। এবারের বইমেলার বিন্যাস গতবারের মতো অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। তবে কিছু আঙ্গিকগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে মেট্রোরেল স্টেশনের অবস্থানগত কারণে গতবারের মেলার বাহির পথ এবার মন্দির গেটের কাছাকাছি স্থানান্তর করা হয়েছে। টিএসসি, দোয়েল চত্বর, এমআরটি বেসিং প্ল্যান্ট এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অংশে মোট আটটি প্রবেশ ও বাহির পথ থাকবে। গত বছরের মতো শিশু চত্বর রমনা কালীমন্দির গেটে প্রবেশের ঠিক ডান দিকে বড় পরিসরে রাখা হয়েছে। যেন শিশুরা অবাধে বিচরণ করতে পারে এবং তাদের কাঙ্ক্ষিত বই সহজে সংগ্রহ করতে পারে। প্রতি শুক্র ও শনিবার মেলায় বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত শিশু প্রহর থাকবে। শিশুদের বহুমুখী করতে এটি বাংলা একাডেমির একটি ভালো উদ্যোগ। অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন রেখেছে কর্তৃপক্ষ। ১৭০টি লিটলম্যাগ স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তথ্যমতে, এবারের বইমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে নতুন পুনর্মুদ্রিত ১০০টি বই।
বইমেলার স্বার্থে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ, র্যাব, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। মেলার প্রবেশ ও বাহির পথে পর্যাপ্তসংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অমর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০২৩ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগত মান বিচারে সেরা বইয়ের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং ২০২৩ সালের বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে থেকে শৈল্পিক বিচারে সেরা বই প্রকাশের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হবে। এ ছাড়া ২০২৩ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগত মান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’ এবং এ বছরের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হবে। ১ থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন মেলা বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। রাত সাড়ে ৮টার পর কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না। ছুটির দিন বইমেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। ২১ ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু হবে সকাল ৮টায়, চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।
বেশ কিছুদিন হলো বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা একাডেমির মান নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তার উত্তরে বলেন, ‘অনেক আবর্জনার ভেতর থেকেও আমরা ভালো মানের লেখা খুঁজে পাই। বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চা এখন অনেক বেড়েছে। কম বয়সী অনেক লেখক ভালো ভালো পুরস্কার পাচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, ২০২১ সালে তিনি মহাপরিচালক পদে আসীন হওয়ার পর বাংলা একাডেমির নির্বাহী পরিষদের নির্বাচনি প্রক্রিয়া সংশোধন করতে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। বর্তমানে নির্বাচনের বিধিমালা ও ভোটার তালিকা প্রণয়নের বিষয়টি এখন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় দেখভাল করছে।
অমর একুশে বইমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন এই মেলার মাধ্যমে ঘ্রাণ পেতে থাকে। ভালো মানের বইমেলা হলো অন্তরাত্মার অক্সিজেন।
অনেকেই এই মাসটির জন্য মুখিয়ে থাকেন। আজকের প্রজন্মকে অমর একুশে বইমেলা সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। প্রযুক্তির আসক্তি থেকে বের হয়ে গ্রন্থের আলোয় চক্ষু শিথিল করার কৌশল তৈরি করে দিতে হবে অভিভাবকদের। অমর একুশে বইমেলা সফল হোক, সার্থক হোক, সেই প্রত্যাশা সবার।