আজ পহেলা ফাল্গুন, বসন্ত ঋতুর প্রথম দিন। আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবসও। একই সঙ্গে বিদ্যাদেবী সরস্বতীর বাণী অর্চনা আজ। ত্রিমাত্রিক তাৎপর্যে উদ্ভাসিত বিশেষ একটি দিন। দেশ ও জাতির জন্য শান্তি-সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের বার্তা নিয়ে এসেছে দিনটি।
গোটা সমাজে এখন অস্থিরতা বিদ্যমান। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অনিশ্চয়তা এখন বিদ্যমান নেই, কিন্তু দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে বৃহত্তর জনজীবন বিপর্যস্ত। সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবন নির্বাহে স্বস্তি-শান্তি পাচ্ছেন না। অপরদিকে দেশে সামাজিক অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে তুলেছে অব্যাহত অনৈতিক কর্মকাণ্ড। বেশ কিছুদিন ধরে যৌন হয়রানির প্রতিবাদে, অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে লাগাতার আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে দেশের প্রধান তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের অন্তর্নিহিত মর্মবাণী আমাদের নিবিড়-গভীর অনুভবে, উপলব্ধিতে সত্য ও কল্যাণময় হয়ে উঠুক। এই কল্যাণ সামষ্টিক, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়। উচ্ছল তারুণ্যের রঙে মন রাঙিয়ে দিক পারস্পরিক মৈত্রী-মমতা, সৌহার্দ্য সম্প্রীতির পরশ। হিংসাবিদ্বেষ পরশ্রীকাতরতা, ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তা চিরতরে দূরীভূত হোক। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক সাম্য, অবসান ঘটুক অন্যায় বৈষম্য ও হীনম্মন্যতার। সম্মিলিত ঐকতানে ও প্রয়াসে আমরা যদি একটি মালায় গ্রথিত হতে পারি, তাহলে অজ্ঞানতা-কুসংস্কার, অন্ধ গোঁড়ামি থেকে মুক্ত হতে পারব। হটিয়ে দিতে পারব পশ্চাৎপদতাকে। বিশ্বায়নের এই কঠিন জটিল প্রতিযোগিতাপরায়ণ সময়ে ঐক্য, পরমতসহিষ্ণুতা, গভীর দেশপ্রেম, জ্ঞানের নিরবচ্ছিন্ন চর্চা আমাদের প্রগতি ও ঋদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারে। এখন আর পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। আমরা যেহেতু একটি গ্লোবাল ভিলেজের বাসিন্দা, সুতরাং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের থাকতে হবে। অর্জন করতে হবে জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা ও সক্ষমতা। দৃপ্ত পদভারে তাল মিলিয়ে চলতে হবে যুগের সঙ্গে।
উন্নয়ন আমাদের চাই। কিন্তু তার মূল্যে-মানবিকতা যেন হারিয়ে না যায়। সমাজে আমরা যে নৈতিকতার স্খলন দেখতে পাচ্ছি, তাতে শিউরে উঠতে হয়। কীটপতঙ্গ, পশুপাখি, জীবজন্তুর জীবনের সঙ্গে মনুষ্যজীবনের মেরুদূর পার্থক্য রয়েছে। মূল্যবান একটি আপ্তবাক্য এ রকম: গাছপালা সহজেই গাছপালা, তরুলতা সহজেই তরুলতা, কিন্তু মানুষ অতি কষ্টে মানুষ। আশরাফুল মাখলুকাত বলা হয় মানুষকে। এর অর্থ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হচ্ছে মানুষ। সত্যিকারের মানুষের মতো মানুষ হতে হলে পশুবৃত্তিকে জয় করতে হয়। রিপুর সংযম প্রয়োজন। আছে নৈতিকতার নানাবিধ বিধিনিষেধের বেড়াজাল, আছে সামাজিক ট্যাবুও। ইদানীং আমরা দেখতে পাচ্ছি নিত্যধর্ষণের ঘটনা, নারীর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মাত্রা ও হার উৎকণ্ঠা ও আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। সিঁধ কেটে ধর্ষণ, মই বেয়ে বাড়িতে অনুপ্রবেশ করে ধর্ষণের ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি শিক্ষায়তনেও বেড়েছে যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা। উপর্যুপরি এসব কলঙ্কিত ঘটনা ঘটেই চলেছে। সমাজদেহে যে পচন ধরেছে, এসব ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও সংখ্যা বৃদ্ধি সেটাই প্রমাণ করে। এই লজ্জা ও অপমানের গ্লানি আমাদের সবার।
ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। পাশবিক প্রবৃত্তি ও লালসা চরিতার্থ করার হীন মানসে মানুষ নামের পশুরা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা তার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। কিন্তু তাতেও ঈপ্সিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এই বিধ্বংসী প্রবণতা থেকে সমাজকে মুক্ত করা সম্ভবপর হয়ে উঠছে না কিছুতেই। বিপজ্জনক এক সময়স্তর পার করছি আমরা। উত্তরণের পথ কী, পরিণতি কোথায়? নিশ্চয়ই অন্ধকার মূঢ়তা একদিন অবসিত হবে, সে জন্য লড়াই জারি রাখতে হবে। এই যুদ্ধে কোনো আপস নয়, এই হীনতা ও অগৌরবের
কাছে কোনোভাবেই নতিস্বীকার করা উচিত নয়, বাঞ্ছনীয় নয়। এই শুভবোধ আমাদের মধ্যে জাগ্রত হোক, এই নিন্দনীয় ঘৃণ্য অধ্যায় থেকে যত তাড়াতাড়ি আমরা মুক্ত হতে পারি, ততই মঙ্গল। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে এই হোক আমাদের প্রত্যয় ও অঙ্গীকার।
আজ পহেলা ফাল্গুন। ঋতুরাজ বসন্তের সূচনা দিন। সারা বছর আমরা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে চলি। খ্রিষ্টীয় বছরের দিন-তারিখের ওপর নির্ভরশীল আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। তরুণ-তরুণীদের বিশেষ ধন্যবাদ জানাতেই হয়, বছরে মাত্র দুটি দিন তারা সাড়ম্বরে ঐতিহ্যমুখীও শিকড়সম্পৃক্ত হন। একটি হলো পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন, দ্বিতীয়টি হলো এই পহেলা ফাল্গুন। পুষ্পিত উদযাপনের চল অনেক দিন ধরেই আমরা দেখছি। ধীরে ধীরে এই উৎসবের ব্যাপ্তি ও মাত্রা বেড়ে চলেছে। নিজস্ব শিকড়ের সন্ধান করা অতি অবশ্যই প্রয়োজন। যৌন নিপীড়নমুক্ত নির্মল একটি সমাজ বিনির্মাণ হোক আমাদের পহেলা ফাল্গুন এবং ভালোবাসা দিবস উদযাপনের মূলমন্ত্র।