দেশে দিন দিন প্রতিবন্ধীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবন্ধী হিসেবে জন্মগ্রহণ করার স্পষ্ট একক কোনো কারণ এখন পর্যন্ত গবেষকরা খুঁজে পাননি। তবে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম বংশগত কারণ ও পরিবেশদূষণ। এ ছাড়া প্রক্রিয়াজাত খাবার যেগুলো গর্ভবতী মায়ের জন্য ক্ষতিকর। গর্ভবতী মায়ের চারপাশের পরিবেশও প্রভাব ফেলে গর্ভের সন্তানের ওপর। গর্ভবতী মায়ের ওপর মানসিক চাপের কারণেও অনাগত সন্তানের যেকোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া বাবা-মায়ের অধিক বয়স অথবা বংশগত কারণ, যেমন- রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের মধ্যে কেউ প্রতিবন্ধী থাকলে। দেশে প্রতি হাজারে ২৫ দশমিক ৫ জন কোনো না কোনো প্রতিবন্ধিতার শিকার। লিঙ্গভেদে নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রতিবন্ধিতার হারে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার ২৫ দশমিক ৬ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৫ দশমিক ৪। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নতুন এক জরিপ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটির নাম ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২২’। প্রতিবেদনটি গত ৩১ জানুয়ারি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, লিঙ্গনির্বিশেষে শহরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে প্রতিবন্ধিতার হার পল্লি অঞ্চলের মানুষের তুলনায় কম। শহরে প্রতি ১ হাজারে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ২৩ দশমিক ২, পল্লি অঞ্চলে যা ২৬ দশমিক ২। প্রতিবন্ধিতার সর্বোচ্চ হার ময়মনসিংহ বিভাগে। এ বিভাগে প্রতি হাজারে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৩০ দশমিক ৩। এর পরের অবস্থানে থাকা রাজশাহী বিভাগে প্রতি হাজারে এ সংখ্যা ২৮ দশমিক ৬। সিলেট বিভাগে প্রতিবন্ধিতার ব্যাপকতা সবচেয়ে কম; প্রতি হাজারে ২১ দশমিক ৩। পরিসংখ্যান বলছে, ময়মনসিংহ বিভাগে পুরুষের ক্ষেত্রে ২৯ দশমিক ৭ এবং নারীদের ক্ষেত্রে তা ৩০ দশমিক ৯।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ অনুসারে প্রতিবন্ধিতা বলতে একজন ব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধি, বিকাশগত বা সংবেদনশীল বৈকল্য এবং পরিবেশগত বাধাগুলোর মিথস্ক্রিয়াকে বোঝানো হয়েছে; যা তাদের সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অন্যদের মতো সমভাবে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে। এ আইনে ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতাকে বিচেনায় নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে অটিজম বা অটিজম থেকে উদ্ভূত প্রতিবন্ধিতা, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, মানসিক অসুস্থতা, যা ধীরে ধীরে প্রতিবন্ধিতার দিকে অগ্রসর হয়। যেমন- দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, কথা বলার প্রতিবন্ধিতা, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, বধির, অন্ধত্ব, সেরিব্রাল পালসি; ডাউন সিনড্রোম, একাধিক প্রতিবন্ধিতা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা। ২০১৩ সালের আইনে বর্ণিত প্রতিবন্ধিতার ধরন ও সংজ্ঞাকে বিবেচনায় রেখে বর্তমান জরিপটি তথ্য সংগ্রহের জন্য মডিউল তৈরি করা হয়েছে।
বিবিএসের ওই প্রতিবেদন বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ধর্মের অনুসারী বিবেচনায় নিলে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের তুলনায় হিন্দুদের মধ্যে প্রতিবন্ধিতার হার কিছুটা বেশি। প্রতি হাজার মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিপরীতে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ২৫ দশমিক ২। অন্যদিকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটি ২৫ দশমিক ৭। অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে প্রতিবন্ধিতার সর্বোচ্চ হার দেখা গেছে। তাদের মধ্যে প্রতি হাজারে ৪৫ দশমিক ৬ জন প্রতিবন্ধিতার শিকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাওহিদা জাহান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতিবন্ধিতার নানা ধরন রয়েছে। এর মধ্যে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারে রয়েছে অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, সেরিব্রাল পালসি, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা। এ ছাড়া জীবনের যেকোনো সময় যেকোনো দুর্ঘটনার কারণে মানুষ প্রতিবন্ধী হয়ে যেতে পারে।’
যখন কোনো নারী গর্ভধারণ করেন, তখন তাকে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার খেতে দিতে হবে। ফরমালিনমুক্ত পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার গর্ভবতী মাকে দেওয়া প্রয়োজন। পরিবেশদূষণ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। এক কথায়, শুধু বংশগত সমস্যা বলে চুপ থাকার সময় নেই। হবু মায়ের জন্য ভাবতে হবে সুষ্ঠু-সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশ সুরক্ষায়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঠিক তালিকাভুক্ত করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে তার প্রাপ্তি সুনিশ্চিত করতে হবে। নারী-পুরুষনির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়ে সমাজ থেকে প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
লক্ষ করা যাচ্ছে যে, প্রতিবন্ধীরা নিজ পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রতি নির্দয় আচরণ করা হয়। প্রতিবন্ধীদের প্রতি সদয় হওয়া আমাদের প্রত্যেক সচেতন মানুষের দায়িত্ব। নিশ্চয়ই আমরা যার যার অবস্থান থেকে সে দায়িত্ব পালন করব।