বাবা-মায়ের বিচ্ছেদে সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নতুন এক জরিপ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশে বিয়ের হার বেড়েছে। বেড়েছে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদও। কিন্তু বিচ্ছেদ হওয়া দম্পতিদের একটি বড় অংশের রয়েছে সন্তান। বিচ্ছেদের ফলে ওই মা-বাবার জীবনের সমস্যার সমাধান হলেও বড় সমস্যায় পড়ছে তাদের সন্তানরা। কারণ তারা মা-বাবা দুজনকেই চায়। তাদের কাছে মা-বাবা দুজনই সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং ভালোবাসার জায়গা। তাই মা-বাবার বিচ্ছেদ সন্তানদের জীবনের জন্য অনেক বড় ক্ষতির কারণ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন ভেঙে যাওয়া পরিবারের সন্তানদের অনেকেই পরবর্তী সময় হতাশাগ্রস্ত হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। অনেকে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পরিবার সংকটে পড়ছে, এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক হলেও পরবর্তী জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তাদের সংসারেও এর প্রভাব পড়ছে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ২০২৩ সালে দুই সিটি করপোরেশন মিলে তালাক হয়েছে ৯ হাজার ৩০৫টি। এ হিসাবে রাজধানীতে প্রতিদিন ভেঙে যাচ্ছে প্রায় ২৬টি দাম্পত্য সম্পর্ক। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় তালাকের ঘটনা ঘটছে একটিরও বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনগতভাবে বাংলাদেশে বিচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি খুব সহজ হওয়ায় তাদের সন্তানের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগেই বিচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে। ফলে পরবর্তী সময়ে অভিভাবকত্ব, ভরণ-পোষণ এবং মা-বাবা কে কীভাবে, কতখানি সময় দেবেন সন্তানের স্বাভাবিক জীবনের জন্য, তা নিয়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
বাবা-মায়ের সান্নিধ্য আর ভালোবাসা না পাওয়ায় অনেক শিশু মাদকাসক্তও হয়ে পড়ছে। এভাবে বিপন্ন শিশুদের পরিসংখ্যান দিন দিন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। একটি শিশুর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে মা-বাবার যে ভূমিকা, তা থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে শিশুরা বঞ্চিত হওয়ার মারাত্মক প্রভাব তাদের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা তৈরি করে। সমাজে স্বাভাবিক নাগরিক হিসেবে বসবাসের ক্ষেত্রে পরিচয় তৈরি এবং পারিবারিক শাসনের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রক্রিয়াই এক ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, যা শিশুকে সব সময় মানসিক অস্থিরতার মধ্যে রাখে এবং শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে নানাবিধ প্রতিকূলতা তৈরি করে। এই প্রতিকূলতা শিশুকে নির্মম জীবনযাপনে ঠেলে দেয় এবং নানাবিধ সহিংসতার মুখোমুখি করে।
বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ার, সাইকোথেরাপিস্ট অ্যান্ড সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর, সায়ক লোহানী বলেন, ‘আমাদের দেশে কাউন্সেলিং এখনো এতটা পরিচিতি নয়, বিশেষ করে ম্যারেজ কাউন্সেলিং। বিবাহবিচ্ছেদ প্রক্রিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন তিন মাসের পরিবর্তে আরও বেশি হওয়া উচিত। ওই সময় অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা বা সম্পর্ক পুনর্গঠন করার বিষয়ে কাউন্সেলিং নেওয়া নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। অন্যদিকে সন্তান বর্তমান থাকলেও কাউন্সেলিং সেবায় আনা প্রয়োজন তাদের ভবিষ্যতের সুস্থ জীবনযাপনের জন্য। এই অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সেলিং সেবায় অনেক সময় ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব।’
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের চারটি মূল নীতির একটি হলো শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের ফলে শিশুর ওপর দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব ফেলে। এ জন্য শিশুবান্ধব আইন কার্যকর করতে হবে। যাতে শিশুদের জীবন বিপন্ন না হয়ে ওঠে। অন্যদিকে বিচ্ছেদ বা তালাক ঠেকাতে অন্তর্বর্তীকালীন সালিশ প্রক্রিয়াকে বাধ্যতামূলক করা অতি জরুরি। সালিশ পরিষদে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে তাদের সঠিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে একটি পরিবারকে বিচ্ছেদ থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।