শব্দদূষণ মারাত্মক রূপ নিয়েছে। সঠিক অনুধাবনের অভাবে দিন দিন এই দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। অনেক পরিবেশবিদ বাংলাদেশের শব্দদূষণকে ‘শব্দসন্ত্রাস’ বলে অভিহিত করেছেন। ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটে, বাড়িতে, অফিসে আমরা প্রতিনিয়ত শব্দদূষণের শিকার হচ্ছি। রাস্তাঘাটে যেভাবে হর্ন বাজানো হচ্ছে, তাতে মানুষ নীরবেই বধির হয়ে যাচ্ছে। যেখানে বিশ্বব্যাপী মানুষ পরিবেশদূষণ রোধে সোচ্চার, সেখানে বাংলাদেশে শব্দদূষণের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে।
বিধিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। বাণিজ্যিক এলাকায় তা যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ ডেসিবেল। কিন্তু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এই মাত্রা সব সময় অতিক্রম করে যাচ্ছে।
হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল শব্দমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। অথচ ঢাকা শহরে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় দিন নেই, রাত নেই পাইলিংয়ের কাজ, ইট ভাঙার যন্ত্র, সিমেন্ট মিক্সারের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। এসব দেখার যেন কেউ নেই। ২০১৭ সালে সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপে শহরগুলোতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইনের বাস্তবায়ন, প্রতিপালন, পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহারে রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক ও ব্যক্তি পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা জানান, শব্দদূষণকে বলা হয় নীরব ঘাতক। শব্দদূষণের সঙ্গে বধিরতার সম্পর্ক রয়েছে। আকস্মিক তীব্র শব্দে অন্তকর্ণের ক্ষতির কারণে মানুষ আংশিক বা সম্পূর্ণ বধির হয়ে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি ১ হাজার জনের মধ্যে একজন জীবনের কোনো না কোনো সময় বধির হয়ে যেতে পারে। শব্দদূষণ থেকে বধিরতা ছাড়াও নানা জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ৩০টি কঠিন রোগের কারণ ১২ রকমের দূষণ, যার মধ্যে শব্দদূষণ অন্যতম। শব্দদূষণের কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃৎস্পন্দনে পরিবর্তন, হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে যেতে পারে। এ জন্য শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, দিক ভুলে যাওয়া, দেহের নিয়ন্ত্রণ হারানো, মানসিক ক্ষতিসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা সৃষ্টি করে।
এ প্রসঙ্গে ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, বেশি মাত্রার শব্দদূষণের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় স্নায়ুর। সেখান থেকে শ্রবণশক্তির ওপর প্রভাব পড়ে। সেই সঙ্গে অনিদ্রা দেখা দেয়। মস্তিষ্কের কোষে অস্বস্তিকর প্রভাবের ফলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, মাথায় যন্ত্রণা হয়, খাওয়ার রুচি কমে যায়। ফলে ধারাবাহিকভাবে আরও অনেক জটিলতার সৃষ্টি হয়।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের নাক, কান, গলা বিভাগের অধ্যাপক মনিলাল আইচ লিটু খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশে বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে শব্দদূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা মানুষের কেবল শ্রবণশক্তিই নয়, শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেরও ক্ষতি করছে। অন্য অনেক রোগের কারণও হয়ে উঠেছে। এমনকি হৃদরোগ, স্মৃতিভ্রম, স্নায়ুর সমস্যাও হচ্ছে মানুষের। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিশেষ কিছু পেশার মানুষের মধ্যে শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব খুবই বেশি দেখা যাচ্ছে।’
শব্দদূষণ রোধ করতে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া ও প্রশাসনের তৎপরতা বৃদ্ধি করা অতি জরুরি। বৃক্ষ অনেকটা শব্দ প্রতিরোধ করে এর তীব্রতা কমিয়ে দেয়। তাই শহরাঞ্চলে ও গ্রামে রাস্তার দুই পাশে বেশি বেশি বৃক্ষ লাগিয়ে শব্দের তীব্রতা কমানো যেতে পারে। আর সবচেয়ে বেশি দরকার জনসচেতনতা। মানুষকে বুঝতে হবে, জানতে হবে কোনটা খারাপ আর কোনটা ভালো।
শব্দদূষণ রোধ করতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। সড়কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে একটি সুন্দর সমাধান করতে
হবে কর্তৃপক্ষকে। তাহলে পরিবেশের মারাত্মক এই দূষণ থেকে মানুষকে মুক্ত রাখা সম্ভব হবে।