একটি কণ্ঠ লাখো অনুপ্রেরণার উৎস। কণ্ঠটি আর কারও নয়, তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আগুনের ফুলকি ঝরে পড়েছিল সেদিন তার কণ্ঠ থেকে। একজন ভাষাতাত্ত্বিক না হয়েও তার বক্তব্যের গভীরতা আজও চিরস্মরণীয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশনা ও ডাক। এই ভাষণই ছিল বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের শোষণ, বঞ্চনা আর অবহেলা থেকে মুক্তির ধারাবাহিক আন্দোলনের চূড়ান্ত নির্দেশনা। বঙ্গবন্ধু গণমানুষের অধিকার আদায়ের জন্য জনসমক্ষে বহু ভাষণ দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ। আবহমান বাংলার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ একই সূত্রে গাঁথা। তার সৎ, সাহসী ও আপসহীন সংগ্রামের কারণেই বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হতে থাকে। সেই সময়ের হাত ধরেই এগিয়ে যায় আন্দোলন। ১৯৭০ সালের ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের উভয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ শপথ গ্রহণ করার আগে বঙ্গবন্ধু ও তার দলের সদস্যরা সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি পাকিস্তানি সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানকে অনতিবিলম্বে পার্লামেন্টের অধিবেশন ডাকার দাবি করে জানান, অধিবেশন হতে হবে ঢাকায়। ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ পরিচালনা করেন। ৬ ও ১১ দফার ভিত্তিতে দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও জনগণের প্রতি অনুগত থাকার শপথ গ্রহণ করেন সংসদ সদস্যরা। এরপর ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যে দফার দফায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানে গমনের প্রাক্কালে ঢাকা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের একটি দুরভিসন্ধিমূলক বক্তব্য দেন। ১৬ জানুয়ারি ইয়াহিয়া খান তার সামরিক ও গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে করাচিতে এক গোপন আলোচনায় মিলিত হন। ১৭ জানুয়ারি পাখি শিকারের নামে তিনটি হেলিকপ্টারে করে বৃহৎ দলটি জুলফিফার আলী ভুট্টোর লারকানার প্রাসাদের বাগানে অবতরণ করে। সেই রাতে তারা পাখি শিকার করার পরিকল্পনা করেনি, তারা করে বাঙালি শিকারের নীল পরিকল্পনা। এই আলোচনাই ‘লারকানা ষড়যন্ত্র’ নামে পরিচিত।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা কখনোই বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। এদিকে তারা নিষ্ফল আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকে। ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বিশাল সৈন্য সমাবেশ, ইয়াহিয়ার ১ মার্চে পার্লামেন্টের অধিবেশন স্থগিত করা ইত্যাদি তথ্য জানতে পারেন বঙ্গবন্ধু। তিনি ১ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন ও হরতালের কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তিনি বাঙালিদের সংগ্রামের প্রস্তুতির নির্দেশনাদানের জন্য ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে রেসকোর্স ময়দান ৭ মার্চ জনসমুদ্রে রূপ নেয়। বেলা সাড়ে ৩টায় রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু তার দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেন।
পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ভাষণ এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একটি অলিখিত ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে লাখ লাখ বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে। তিনি বললেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’
বাঙালি জাতির স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের এক মোক্ষম সময়ে তিনি এই ভাষণ দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিকামী মানুষ স্বাধীনতা অর্জনের প্রচেষ্টার জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তিনি দেশ ও দেশের বাইরের কোটি কোটি শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির অনুপ্রেরণা। তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে অনেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের ‘গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস’, মার্কিন লুথার কিংয়ের ‘I have a dream’, প্যাট্রিক হেনরির ‘Give me liberty or give me death’ ইত্যাদি ভাষণের সঙ্গে তুলনায় টেনে আনেন। অস্তিত্বের লড়াইয়ে কোনো রকম বিচলিত হননি এই সিংহপুরুষ। ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা গভীরভাবে ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্লেষণ করেছেন। তারা দেখিয়েছেন একটি স্বাধীন জাতির উত্থানের পেছনে এই ভাষণের গুরুত্ব অপরিসীম। এক কথায় বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।