বিষণ্নতায় ভুগতে থাকা মানসিক রোগীদের মধ্যে তরুণরাই সর্বাধিক। মানসিক স্বাস্থ্যের সমৃদ্ধি এবং সুরক্ষাও একটি সর্বজনীন মানবাধিকার। মানসিক সুস্থতা আমাদের সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ মানসিক সহায়তা না পেয়ে হতাশায় ভুগছে। নিজে থেকেই যে মনের যত্ন নেওয়া যায়, নিজের পাশে দাঁড়ানো যায়, তা অনেকেই বুঝে উঠতে পারে না। অনেক তরুণ-তরুণীর মন ভাঙলে নিজেকেই নিঃশেষ করে দেয়। শিশু-কিশোর ও তরুণদের হতাশার দায় মূলত সমাজ বা অভিভাবকদের। তাদের জন্য যে বিকল্প বিনোদন বা সংস্কৃতিচর্চা দরকার, তা দিতে ব্যর্থ সমাজ বা অভিভাবক। সংস্কৃতিচর্চা থেকে সরে আসায় তারা ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছে, এমনকি অসৎ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই তাদের মানসিকভাবে সুস্থতার কোনো বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তরুণ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তির জন্য বেশ কিছু কারণ দায়ী। এর মধ্যে নানা ধরনের ভাইরাসের বিস্তার, রাত জাগা, পারিবারিক ও মানসিক অস্বাস্থ্যকর জীবনাচার, শিক্ষাব্যবস্থা, একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়া, মা-বাবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার অভাব, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতি আসক্তি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিষণ্ণতা, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন অসংগতির কারণে তরুণরা আজ বিপথগামী।
বর্তমানে দেশের তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি ব্যাপক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নানা কারণে অবসাদগ্রস্ত তরুণ-তরুণীরা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। তরুণদের আত্মহত্যার এই প্রবণতা নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মানসিক চাপ, ভালোবাসায় জটিলতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বিষণ্নতা, আর্থিক সমস্যা ছাড়াও যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তরুণরা আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকছে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, তরুণ প্রজন্ম এখন সবচেয়ে বেশি দুর্বল। একটুতেই তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। মানসিকভাবেও তারা খুব সহজেই ভেঙে পড়ে, বিষণ্নতায় ভোগে। এর মূল কারণ হচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই কোনো ধরনের শারীরিক পরিশ্রম করে না। তারা অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত। অনেকেই বিভিন্ন ডিভাইসে আসক্ত হয়ে সারা রাত জেগে থাকে। ফলে তাদের অনিদ্রাসহ নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের খাওয়ানোর ধরনগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অস্বাস্থ্যকর। বিশেষ করে অল্প বয়সী শিশুদের মিষ্টি খাবার খাওয়া এবং কোমল পানীয় গ্রহণ করা- যা নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। তাদের মধ্যে স্থূলতা দেখা দেয়। কৈশোর-তারুণ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ছোট বয়স থেকেই তাদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা থাকে, তারা দুর্বলতাকে সঙ্গী করে বড় হতে থাকে।
বেশির ভাগ পরিবারেই অভিভাবকদের সঙ্গে সন্তানদের দূরত্ব বাড়ছে। অভিভাবকরা এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় ও দিকনির্দেশনা দিতে পারেন না। যখন সন্তানরা নিজেদের কর্তৃত্বের বাইরে চলে যায়, তখন করার কিছুই থাকে না। সন্তানরা তখন নিজেদের মতো জগৎ খুঁজে নেয় এবং অনেকেই বিপথগামী হয়ে থাকে। তারা নিজেদের রুমে আবদ্ধ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনোনিবেশ করে এবং রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমায়। জীবনে কোনো শৃঙ্খলা নেই তাদের। জীবনযাত্রায় অস্বাস্থ্যকর এক পরিবেশ তৈরি করে ফেলে তরুণরা। অনেকের অভিভাবক নিজেরাও নানা অসংলগ্ন কার্যক্রমে জড়িত থাকেন, ফলে সন্তানরাও সেদিকে ধাবিত হয়।
প্রখ্যাত মনোবিদ অধ্যাপক ড. মেহতাব খানম খবরের কাগজকে বলেন, অনেকেই তরুণ প্রজন্মের দুঃসময়ের জন্য পরিবারকে দায়ী করে থাকেন। কিন্তু পরিবার তো একা দায়ী নয়; বরং পরিবারও অসহায় হয়ে পড়ে। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তেমন সুস্থ পরিবেশের দেখা মেলে না, তরুণ প্রজন্মকে মনোরম পরিবেশে ধরে রাখার মতো পরিস্থিতি নেই বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে। ফলে তরুণ প্রজন্ম নানাভাবে বিপথগামী হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে।
তরুণদের উজ্জীবিত করার মূল দায়িত্ব নিতে হবে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে। এ ছাড়া মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম দরকার। সুষম, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করতে হবে। সুস্থ-স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। মাদকাসক্তিসহ যেকোনো ধরনের আসক্তি থেকে দূরে থাকতে হবে। তরুণদের বিষণ্নতা, উদ্বেগ, রাগ, হতাশা, বিরক্তি, মানসিক চাপের মতো বিষয়গুলো পারিবারিকভাবেই সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সামাজিক ও পারিবারিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তরুণসমাজকে এমন পরিস্থিতি থেকে সুরক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন করে কর্মকৌশল তৈরি করতে হবে।