ডেঙ্গু দেশে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দিন দিন যেন শক্তিশালী হচ্ছে এডিস মশা। এই পরিস্থিতির জন্য সব মহল থেকেই দায়ী করা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাবকে। কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, একদিকে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, অন্যদিকে বিরতি দিয়ে বৃষ্টির কারণে যে পরিবেশ তৈরি হয়, তা মশার প্রজননবান্ধব। এমন পরিবেশ যেকোনো মশা ও পোকামাকড় বংশবৃদ্ধির সহায়ক হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে মশা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হচ্ছে এর প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করে ফেলা। তা না হলে মশা থেকে কোনোমতেই সুরক্ষা মিলবে না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডেঙ্গু একটি সংক্রমণ ভাইরাস, যা সংক্রমিত হয় মশার কামড়ের মাধ্যমে। এটি বিশ্বব্যাপী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুতে বেশি হয়ে থাকে।
তথ্যমতে, এডিস মশার প্রজননের জন্য ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রা সবচেয়ে উপযুক্ত। ২৫ থেকে ৩৫ ডিগ্রির মধ্যে তাপমাত্রা এডিসের প্রজননবান্ধব। আমাদের দেশে এই তাপমাত্রা থাকে মৌসুমজুড়ে। কেবল রাজধানী ঢাকাতেই নয়, ঢাকার বাইরেও এর বিস্তার ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এবার উপকূলীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার বেশি হবে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে বিগত ২৩ বছরে যত ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছে, ২০২৩ সালে এক বছরেই তার থেকে বেশি রোগী আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ গত ২৩ বছরে দেশে ডেঙ্গু রোগী ছিল প্রায় আড়াই লাখ। ২০২৩ সালে মাত্র এক বছরেই আক্রান্ত হন প্রায় ৩ লাখ। এই সংখ্যা শুধু হাসপাতালে ভর্তিকৃতদের। এর বাইরেও ছিল অনিবন্ধিত শত শত রোগী। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এতেই বোঝা যায়, ডেঙ্গু রোগী নিয়ে আমাদের এবার আগে থেকেই সতর্ক না হয়ে কোনো উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।’
শুধু শুধু কীটনাশক প্রয়োগ করে কিছু করা যাবে না। যেভাবে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ফগার মেশিন দিয়ে কীটনাশক প্রয়োগ করেন, এতে কিছু উড়ন্ত মশাকে হয়তো নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু মশার প্রজনন মূলত হয় লার্ভার জন্য, আর লার্ভা থাকে পানিতে। পানিতে লার্ভার মাত্রা অনেক বেশি। পানিতে যদি মশা নিধন করার কোনো ওষুধ ছিটানো হয়, তাহলে ওষুধ পানির মধ্যে মিশে যাবে। মশার লার্ভা ধ্বংসে সেই ওষুধ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
কীটতত্ত্ববিদ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহবুবার রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে আমাদের দেশে মশার বিস্তার ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাপমাত্রা যত বাড়তে থাকবে, এই মশার বিস্তারও তত বাড়বে। গতবারের চেয়ে এবার বেশি বিস্তার ঘটতে পারে ডেঙ্গুর। নিধন করে আমরা কখনোই মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না।’
প্রজননক্ষেত্রগুলোকে মশার জন্য প্রতিকূল করতে হবে। আমাদের যে নালা-নর্দমা আছে, সেখানে যেন পানি আটকে না থাকে বা জলাবদ্ধ না হয়, তার জন্য নালা-নর্দমায় পানিপ্রবাহের ব্যবস্থা করতে হবে। মশার বাসস্থানগুলো ধ্বংস করতে হবে। এটা না করে শুধু ওষুধ ছিটালে কাজ হবে না। দ্রুত মশা মারার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে যেহেতু এডিস মশার চরিত্র পাল্টাচ্ছে, তাই চিকিৎসা পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে লার্ভার তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। নিয়ম না মানলে জরিমানাসহ আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।