সমুদ্রপথে বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও নিরাপত্তার অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের কবলে পড়ছে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো। গত ১২ মার্চ এমভি আবদুল্লাহ নামে বাংলাদেশের জাহাজটি ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবলে পড়ে। জাহাজে থাকা ২৩ নাবিককে জিম্মি করে দস্যুরা। জাহাজটি কয়লা নিয়ে আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। দীর্ঘ ৩২ দিন পর মুক্তি পেলেন জাহাজ ও নাবিকরা। জীবনের শঙ্কা নিয়েই কি চলবেন সমুদ্রপথে নাবিকরা? সমুদ্রপথে জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায় ঘটলেও এর কোনো প্রতিকার নেই।
সোমালিয়ান জলদস্যুদের দাবি অনুয়ায়ী মুক্তিপণ নিয়ে একটি উড়োজাহাজ (১৩ এপ্রিল) বিকেলে জিম্মি জাহাজের ওপর চক্কর দেয়। জাহাজের ২৩ নাবিক অক্ষত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপর উড়োজাহাজ থেকে ডলারভর্তি তিনটি ব্যাগ সাগরে ফেলা হয়। স্পিডবোট দিয়ে এসব ব্যাগ জলদস্যুরা কুড়িয়ে নেয়। দাবি অনুযায়ী মুক্তিপণ গুনে নেয় জলদস্যুরা। তবে চুক্তি অনুযায়ী জাহাজটি যথাসময়ে ছাড়েনি দস্যুরা।
কেএসআরএমের মালিকানাধীন এসআর শিপিংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মেহেরুল করিম বলেন, ‘আমরা উদ্ধার প্রক্রিয়ার জন্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে মনোনীত প্রতিনিধির মাধ্যমে জাহাজ ও নাবিকদের উদ্ধার করেছি।’ তিনি বলেন, ‘উদ্ধার প্রক্রিয়ায় আমরা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম মেনেছি এবং ইউকে (যুক্তরাজ্য) ও সোমালিয়ার নিয়ম মেনেছি, এমনকি কেনিয়ার নিয়মও মেনেছি। আমরা সবকিছু আইন মেনে করেছি।’
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি সোমালিয়া’ ও ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা ‘রয়টার্স’-এর প্রতিবেদনের তথ্যমতে, এমভি আবদুল্লাহ জাহাজ ও নাবিকদের উদ্ধারে জলদস্যুদের ৫০ লাখ ডলার মুক্তিপণ দেওয়া হয়েছে; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৫ কোটি টাকা।
দুই দস্যু রয়টার্সকে জানিয়েছে, দুই দিন আগেই মুক্তিপণের অর্থ পেয়ে যায় তারা। পরে সেগুলো আসল নাকি নকল, যাচাই করে তারা। মুক্তিপণের অর্থ পেলেও দস্যুরা তাৎক্ষণিকভাবে জাহাজ থেকে নেমে যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, জলে-স্থলে নজরদারি এড়াতেই গভীর রাতে দস্যুরা জাহাজ থেকে নেমে যায়। মুক্তিপণের অর্থ পরিশোধের সময় জিম্মি জাহাজটির অদূরে ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ। আবার স্থলভাগে ছিল সোমালিয়ার পুন্টল্যান্ড পুলিশের টহল।
সোমালিয়ার স্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘গারোই অনলাইন’-এর প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সোমালিয়ার স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল পুন্টল্যান্ডের এক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বরাতে সংবাদমাধ্যমটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ ও ২৩ নাবিককে জিম্মি করে রাখা আট জলদস্যুকে গ্রেপ্তার করেছে পুন্টল্যান্ড পুলিশ। তবে তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণের কোনো অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে কি না, বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গ্রেপ্তারকৃত সোমালিয়ান জলদস্যুদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এনে বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। জলদস্যুদের বিচার না হলে এই ধরনের দস্যুতা দিন দিন আরও বাড়বে। সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বিশ্ব বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেবে। ফলে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়বে, দেশের সাধারণ মানুষের ওপর এর চাপ পড়বে। সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা না থাকলে নাবিকরাও সমুদ্রে যেতে অনাগ্রহী হবেন। ফলে নৌপথে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সমুদ্রপথের নিরাপত্তা জোরদারে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে। বিশেষ করে চীন ও ভারত বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে পারে। দুই দেশের সঙ্গেই যেহেতু বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভালো, সেহেতু এই দুই দেশের শরণাপন্ন হতে পারে বাংলাদেশ। বিশ্ব বাণিজ্য ত্বরান্বিত করতে নৌপথে আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে প্রয়োজনে আর্মস গার্ডসহ যাবতীয় নিরাপত্তা দিতে হবে। জাহাজেও উন্নত সিটাডেলসহ যাবতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখতে হবে। জাহাজে কাঁটাতার বা রেজর ওয়্যার ঠিকঠাকভাবে স্থাপন করতে পারলে এটিই সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা পদ্ধতি হতে পারে। সমুদ্রে সব সময় প্রস্তুতি থাকতে হবে, যাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দক্ষতার সঙ্গে তা সমাধান করা যায়। জলদস্যুদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও সরকার জাতিসংঘের সহায়তা চাইতে পারে।