ঈদের আনন্দ যেন বিষাদে পরিণত হলো। খবরের কাগজ খুললেই সড়ক দুর্ঘটনার মর্মান্তিক খবর চোখে পড়ে। গত কয়েক দিনে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল অনেক বেড়েছে। এভাবেই কি সড়কপথ রক্তে রঞ্জিত হতে থাকবে?
বিআইডব্লিউটিএ, ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশ জানায়, ঈদের আগে ও পরে সারা দেশে সড়ক ও নৌপথের দুর্ঘটনায় প্রায় ২৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এ ছাড়া ৯ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে দুই শতাধিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার ফরিদপুরের কানাইপুরে বাস ও পিকআপের সংঘর্ষে একই পরিবারের ৬ জনসহ ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। ঈদেও প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ মারা যায়। কিন্তু প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা জানি, কী কারণে সড়কে এত দুর্ঘটনা ঘটছে- ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ট্রাফিক আইন মেনে না চলা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ব্যবহার, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্যবোঝাই, চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর মনোভাব, অদক্ষতা ও অসতর্কতা এবং রেললাইনের অব্যবস্থাপনা। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ চালকদের মাদক সেবন। অতিমাত্রায় মাদক সেবনের কারণে চালক অনেক সময় মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালান এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটান।
এ ছাড়া গাড়িচালকরা রাস্তায় এক অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যা করলে কারাদণ্ডের বিধান প্রস্তাবিত আইনে ১০ বছর করার সুপারিশ করা হয়েছে। তারপরও তারা ট্রাফিক আইন মানেন না। বড় গাড়ি সব সময় ছোট গাড়িকে অতিক্রম করে চলে যায়। এতে দুর্ঘটনা ঘটে। চালকদের অশিক্ষিত ও অসতর্কতার কারণেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
প্রতিটি মৃত্যুই বেদনাদায়ক। সেই মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয়, তবে তা মেনে নেওয়া কঠিন। দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির নিরসন করতেই হবে। এভাবে চলতে পারে না। অকালে এভাবে মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভে যেতে পারে না। দুর্ঘটনার কারণগুলো যেহেতু স্পস্ট, সেহেতু সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দুরূহ কোনো বিষয় নয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, আইনে পরিবর্তন এনে বা সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে ট্রাফিকব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়। তার মতে, ঢাকা মহানগরের রাস্তাঘাটে মূল সমস্যা অব্যবস্থাপনা।
আমাদের দেশের সড়ক নিরাপদ নয় কেন? আমরা কেন মৃত্যুর মিছিল রোধ করতে পারছি না? এ দেশে আইন প্রণয়ন হয়, কিন্তু সেই আইনের বাস্তবায়ন হয় না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সড়ক পরিবহন আইন নিয়ন্ত্রণ করেন মূলত পরিবহননেতারা। সেই নেতারা সরকারদলীয় বড় পদে বহাল থাকেন। যার ফলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইন থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নে নগরের ভেতরে গণপরিবহনব্যবস্থা পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে। দুর্ঘটনা নিরসনে পরিবহন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশ ও সিটি করপোরেশনকেও দায়িত্বশীল হতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় আইন পরিবর্তন ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি চালকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও চালিয়ে যেতে হবে। তবে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চালকদের পাশাপাশি যাত্রী ও পথচারীদেরও সচেতন হওয়া উচিত। সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে ট্রাফিক আইনের আধুনিকীকরণ করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে একনিষ্ঠ হতে হবে। রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে এবং ভুয়া লাইসেন্সধারী যেন গাড়ি চালাতে না পারে, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। কেউ আইন অমান্য করে বেপরোয়াভাবে গাড়ি না চালায়, সে ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। পুলিশ প্রশাসনকে সড়কপথে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। নির্বিশেষে আইন অমান্যকারীকে জরিমানাসহ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।