সারা দেশে বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক-কর্মচারী সমিতি গতকাল মঙ্গলবার ভোর থেকে কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে। এ কারণে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। মূল বেতনের সঙ্গে রানিং অ্যালাউন্স যোগ করে পেনশন প্রদান এবং আনুতোষিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে জটিলতা নিরসন হয়নি রেলওয়ের রানিং স্টাফদের। দফায় দফায় বৈঠক করেও কোনো সুরাহা হয়নি। ফলে সারা দেশে কোথাও যাত্রীবাহী বা মালবাহী কোনো ট্রেন চলছে না। রেলপথ মন্ত্রণালয় গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে রানিং স্টাফদের কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার অনুরোধ জানায়।
রানিং স্টাফরা বলছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজে ফিরবেন না। ১০৬টি আন্তনগর ট্রেনে ৭৫ হাজারের বেশি আসন রয়েছে। অধিকাংশ টিকিট আগাম বিক্রি হওয়ায় ট্রেন না চললে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। লোকাল, কমিউটার, মেইল ট্রেনসহ প্রতিদিন ট্রেনে ৩ লাখ যাত্রী ভ্রমণ করেন। রেল মন্ত্রণালয় গত সোমবার বিজ্ঞপ্তিতে যাত্রীদের কথা বিবেচনা করে কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানালেও কাজ হয়নি। মাইলেজ সুবিধা পুনর্বহালের দাবিতে তিন বছরের বেশি সময় ধরে আন্দোলন করছেন তারা। কয়েক দফায় অতিরিক্ত কাজ থেকে বিরত থাকাসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন রেলওয়ের মহাপরিচালক, রেলসচিব, রেলমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশ্বাসে তারা আন্দোলন থেকে সরে আসেন।
রেলের নিয়ম অনুযায়ী একজন রানিং স্টাফ (চালক, সহকারী চালক, গার্ড, টিকিট চেকার) ট্রেনে দায়িত্ব পালন শেষে তার নিয়োগপ্রাপ্ত এলাকায় (হেডকোয়ার্টার) হলে ১২ ঘণ্টা এবং এলাকার বাইরে (আউটার স্টেশন) হলে ৮ ঘণ্টা বিশ্রামের সুযোগ পান। রেলওয়ের স্বার্থে কোনো রানিং স্টাফকে তার বিশ্রামের সময়ে কাজে যুক্ত করলে বাড়তি ভাতা-সুবিধা দেওয়া হয়, যা রেলওয়েতে ‘মাইলেজ’ সুবিধা হিসেবে পরিচিত। ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় মাইলেজ সুবিধা সীমিত করতে রেল মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে আনলিমিটেড মাইলের সুবিধা বাদ দিয়ে তা সর্বোচ্চ ৩০ কর্মদিবসের সমপরিমাণ করার কথা জানানো হয়।
এ ছাড়া বেসামরিক কর্মচারী হিসেবে রানিং স্টাফদের পেনশন ও আনুতোষিক ভাতার মূল বেতনের সঙ্গে পাওয়া কোনো ভাতা যোগ করার বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়। এর পরই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন রানিং স্টাফরা। একাধিক রানিং স্টাফ অভিযোগ করে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী আট ঘণ্টা ট্রেন চালানোর পর আট ঘণ্টা পূর্ণবিশ্রাম পাবেন কর্মীরা। কিন্তু জনবলসংকটে ১০-১২ ঘণ্টা ট্রেন পরিচালনার পর তিন-চার ঘণ্টা বিরতিতে আবার কাজ করতে হয়।
ইতোমধ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে রানিং স্টাফদের দাবি-দাওয়ার বিষয়গুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাও অব্যাহত আছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে ইতোমধ্যে তাদের রানিং অ্যালাউন্স ৭৫ থেকে ১০০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এ ছাড়া মাইলেজ অ্যালাউন্স পাওয়ার জন্য সর্বনিম্ন ৮ ঘণ্টা ও ১০০ মাইল দূরত্বের শর্তও শিথিল করা হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, রেলের কর্মচারীদের যৌক্তিক দাবি পূরণ করা হয়েছে। এর বাইরে এখন আর কোনো দাবি মানা সম্ভব নয়।
ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছে লাখো মানুষ। পণ্য পরিবহনও বন্ধ রয়েছে। এতে অন্যান্য পরিবহনের ওপর ব্যাপক চাপ পড়েছে। পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় নিত্যপণ্যের বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। জনদুর্ভোগ এড়াতে সরকারকে অবিলম্বে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে রানিং স্টাফদের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করে তাদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। দাবি যৌক্তিক হলে অব্যশ্যই তা পূরণ করতে হবে। সমস্যা জিইয়ে রেখে পরিস্থিতির উন্নতি করা যাবে না।