অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ছয় মাসে অর্থনীতিতে স্বস্তি দিতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর সুফল পেলেও অর্থনীতি অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতিও বেশকিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে হলে জরুরি সংস্কারগুলো আগে করতে হবে। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই গতি বেড়েছে রেমিট্যান্স মজুতে। আগস্ট থেকে প্রতি মাসে টানা ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসছে দেশে। পাশাপাশি বাড়ছে রপ্তানি আয়। স্থিতিশীল হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার। রিজার্ভও মোটামুটি সন্তোষজনক অবস্থায় আছে। সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স এসেছে ২১৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। অর্থনীতির এই দুটি সূচক ইতিবাচক হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে সরকার চাঁদাবাজি ও মজুতদারি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ এখনো তেমনটা নিতে পারেনি। মধ্যস্বত্বভোগীদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে এবং অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের মতো অনিয়ম বন্ধ করতে না পারায় নিত্যপণ্যের দাম কমাতে পারেনি সরকার। কিছু কিছু পণ্যে আমদানি শুল্ক কমানোর পরও এর সুফল ভোক্তা পাচ্ছেন না। যে কারণে মূল্যস্ফীতি এখনো অনেক চড়া। তবে বিবিএসের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারিতে তার আগের মাসের তুলনায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। যদিও মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশের কাছাকাছি। সম্প্রতি সচিবালয়ে ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, অর্থনীতির অবস্থা যতটা খারাপ ভাবা হচ্ছে, ততটা খারাপ নয়। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অবস্থা কখনো শ্রীলঙ্কার মতো হবে না। আগামী বাজেটে ভালো কিছু পদক্ষেপ দেখতে পাবেন।’
বর্তমান সরকার অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরাতে নানাভাবে চেষ্টা করলেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে এখনো। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব, বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমা, অস্থির পুঁজিবাজার ও বৈদেশিক বিনিয়োগে ভাটা। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা না থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসে না। এ জন্য সরকারকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল বিনিময় হার দরকার। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাও বাড়ানো দরকার।
দেশে গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানো দরকার, সেই সঙ্গে শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার।
সরকার চেষ্টা করছে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে, যাতে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পায়। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণেও অনেক সময় অর্থনীতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এ কারণে পুরোপুরি সংকটমুক্ত থাকা সম্ভব না। সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে সরকার অস্থিতিশীল অর্থনীতিতে স্বস্তি দিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রত্যাশা করছি, সরকার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে।